বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমল ৩ শতাংশের বেশি

সংবাদ সারাদিন ডেস্ক | ২ নভেম্বর ২০২৬

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সংঘাত বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হওয়ার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি কমেছে। কাতারের মধ্যস্থতায় টানা তৃতীয় দিনের মতো ইরানি কর্মকর্তাদের আলোচনা অব্যাহত থাকায় সম্ভাব্য সমঝোতার আশা তৈরি হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।

সোমবার (২ নভেম্বর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হালনাগাদ প্রতিবেদনে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের ফিউচার মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৬৮ ডলার বা ৩ দশমিক ২ শতাংশ কমে ১০৯ দশমিক ৭৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৪৩ ডলার বা ৩ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ১০০ দশমিক ৬৯ ডলারে নেমে এসেছে।

এর আগে দিনের শুরুতে ব্রেন্টের দর ছিল ১১১ দশমিক ৮৪ ডলার এবং ডব্লিউটিআইয়ের মূল্য ছিল ১০২ দশমিক ৫৬ ডলার। অর্থাৎ লেনদেনের সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তেলের দামে পতন আরও গভীর হয়েছে।

তৃতীয় দিনের আলোচনায় সমঝোতার আশা

ইরান ও কাতারের কর্মকর্তারা সংঘাত বন্ধে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে টানা তৃতীয় দিনের মতো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

রোববার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

একই সঙ্গে ইরান প্রতিরক্ষা ও কূটনীতি—উভয় পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তবে আলোচনার মাধ্যমে এখনো কোনো চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতি বা শান্তিচুক্তির ঘোষণা আসেনি। ফলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও সংঘাত পুনরায় তীব্র হওয়ার আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি।

মার্কিন নির্বাচনের পর উত্তেজনা বাড়ার শঙ্কা

অক্টোবরের শেষ দিকে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম গত ছয় মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা নতুন করে বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে প্রভাবিত করেছে।

বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাম্প্রতিক মূল্যপতনের পেছনে কূটনৈতিক অগ্রগতির আশা যেমন রয়েছে, তেমনি আগের সপ্তাহের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধির পর স্বাভাবিক বাজার সংশোধনও ভূমিকা রেখেছে।

কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারারের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত সপ্তাহে তেলের দামে বড় উত্থানের পর সোমবার বাজারে প্রযুক্তিগত সংশোধন দেখা যাচ্ছে।

তাঁর মতে, কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা এবং সপ্তাহান্তে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত না হওয়ায় বাজারের তাৎক্ষণিক উদ্বেগ কিছুটা কমেছে।

তবে নির্বাচনের পর সংঘাতকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্য বেড়ে গেলে ব্রেন্ট তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের দিকে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ

ইরান সংঘাতের কারণে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

প্রণালিটি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ব্যয় এবং জ্বালানি পরিবহনের ঝুঁকি বেড়েছে।

হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদক দেশগুলোর তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে এই জলপথে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন সৃষ্টি হলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকট এবং তেলের দামে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

হামলার মধ্যেও সৌদি আরবের তেল রপ্তানি বেড়েছে

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর হামলায় সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উদ্বেগ থাকলেও অক্টোবরে দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানি আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে বলে জানিয়েছে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী দুটি প্রতিষ্ঠান।

তিনটি পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটি অক্টোবরের রপ্তানি বৃদ্ধির তথ্য জানিয়েছে।

বিশ্ব জ্বালানি বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে সৌদি আরবের রপ্তানি পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

ডিসেম্বরে তেল উৎপাদন বাড়াচ্ছে না ওপেক প্লাস

এদিকে জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সংগঠন ওপেক এবং রাশিয়াসহ সহযোগী দেশগুলোর জোট ওপেক প্লাস ডিসেম্বর মাসের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

রোববার (১ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত অনলাইন বৈঠকে সৌদি আরব, রাশিয়া, ইরাক, কুয়েত, আলজেরিয়া, কাজাখস্তান ও ওমানের প্রতিনিধিরা এ সিদ্ধান্ত নেন।

ইরান যুদ্ধের কারণে রপ্তানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন চলতে থাকায় জোটের অনেক সদস্য নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার নিচে অবস্থান করছে।

জোটের পরবর্তী নীতিনির্ধারণী আলোচনায় ২০২৭ সালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ও বাজার পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়তে পারে

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের পরিবর্তন বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম দীর্ঘমেয়াদে কম থাকলে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো এবং পরিবহন ও উৎপাদন খরচের বৃদ্ধি সীমিত রাখার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে সাময়িক মূল্যপতনের অর্থ দেশের বাজারে জ্বালানির দাম তাৎক্ষণিকভাবে কমে যাওয়া নয়। স্থানীয় মূল্য নির্ধারণে আমদানির সময়, বিনিময় হার, কর ও সরকারি মূল্যনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক সমঝোতা সফল হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে নতুন হামলা কিংবা সংঘাতের বিস্তার ঘটলে তেলের বাজার আবারও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।

ফলে আগামী কয়েক দিনে ইরান-কাতার আলোচনা, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির দিকে নজর থাকবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের।

সূত্র: রয়টার্স ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারসংক্রান্ত প্রতিবেদন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *