সংবাদ সারাদিন ডেস্ক | গাজীপুর | ৩ নভেম্বর ২০২৬
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে গাজীপুরে আবারও মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন তৈরি পোশাকশ্রমিকরা। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে ঢাকা–টাঙ্গাইল ও ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের বিক্ষোভে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কের নাওজোর এলাকায় অবস্থান নেন শ্রমিকরা। এর আগে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করলে তাঁরা নাওজোর এলাকায় গিয়ে মহাসড়কে অবস্থান নেন। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং সড়কে আটকা পড়েন বহু যাত্রী।
সালনায়ও শ্রমিক বিক্ষোভের খবর
এদিকে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের সালনা এলাকায়ও শ্রমিকদের বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শ্রমিকদের একটি অংশ সড়কে অবস্থান নিলে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
ভোগড়া বাইপাস এলাকাতেও শ্রমিকদের মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টার তথ্য প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম।
এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।
কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ
গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে মঙ্গলবার সকাল থেকেই শ্রমিকদের জড়ো হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
নাওজোর, চন্দ্রা, মৌচাকসহ কয়েকটি এলাকায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কের একটি অংশে যান চলাচল আবার স্বাভাবিক হয়। তবে গাজীপুরের সব গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল একই সময়ে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি।
নাশকতার অভিযোগে তিন মামলা, গ্রেপ্তারের খবর
এদিকে চলমান শ্রমিক আন্দোলনের সময় পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে সোমবার (২ নভেম্বর) গাজীপুরে তিনটি মামলা করেছে পুলিশ।
কোনাবাড়ী, বাসন ও কালিয়াকৈর থানায় মামলাগুলো করা হয়।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন মামলায় প্রায় ৩ হাজার ৬০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এসব ঘটনায় অন্তত ৩২ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসেন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তবে অন্য কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে মামলার আসামি প্রায় চার হাজার এবং গ্রেপ্তারের সংখ্যা অন্তত ৩০ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট থানার সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী সংখ্যা হালনাগাদ করা প্রয়োজন।
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবি
গত কয়েক দিন ধরে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও রাজধানীর মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষোভ করছেন পোশাকশ্রমিকরা।
শ্রমিকদের দাবির মধ্যে রয়েছে—
- ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ।
- চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহাল।
- আন্দোলনে অংশ নেওয়া শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ।
- শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা।
শ্রমিকদের দাবি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া ও জীবনযাত্রার অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান মজুরিতে সংসার পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এক দিনেই ৬৭০ কারখানায় কাজ বন্ধ
চলমান শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাবে সোমবার দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ব্যাপকভাবে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সোমবার বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে ৬৭০টি কারখানায় কাজ বন্ধ ছিল।
এতে প্রায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক কাজ না করে ফিরে যেতে বাধ্য হন।
তবে দিন শেষে সংগঠনটির অন্য একটি হালনাগাদ হিসাবে আরও বেশি কারখানায় কাজ বন্ধ থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
কারখানা বন্ধের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সময়মতো রপ্তানি পণ্য সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর জরুরি বৈঠক
শ্রমিক আন্দোলন ও শিল্পাঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সোমবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে স্বরাষ্ট্র ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
বৈঠকে শিল্পকারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত, উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
এদিকে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণে নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার।
তবে বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিক অসন্তোষ পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি।
শিল্প খাতে বাড়ছে উদ্বেগ
টানা শ্রমিক বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ এবং বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনায় দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
শ্রমিক নেতাদের একাংশ আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশের পরিবর্তে অন্য দেশে ক্রয়াদেশ সরিয়ে নিতে পারেন।
অন্যদিকে আন্দোলনরত শ্রমিকরা বলছেন, ন্যায্য মজুরি এবং কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের অসন্তোষের স্থায়ী সমাধান হবে না।
এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিক, মালিক ও সরকারের মধ্যে কার্যকর আলোচনা এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।


