দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের উদ্যোগ, স্যামসাং-হুন্দাইয়ের বিনিয়োগ আকর্ষণে আলোচনা

Table of content

Table of content

সংবাদ সারাদিন ডেস্ক | ঢাকা | মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা নতুন পর্যায়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সিউল সফররত উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারের পাশাপাশি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ ও লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে।

বৈঠকগুলোতে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) বাস্তবায়নের পরবর্তী পদক্ষেপ, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, শুল্ক ও বন্দর ব্যবস্থার সংস্কার এবং যৌথ সরকারি-বেসরকারি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) প্রকাশিত সরকারি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (২ নভেম্বর) দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী পার্ক জং-সুংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সেপা চুক্তিকে ঘিরে অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (CEPA) নিয়ে আলোচনা শেষ হওয়ার পর দুই দেশ অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়ে একমত হয়েছে।

বৈঠকে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে প্রধানত তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এখন এই সম্পর্ককে প্রযুক্তিনির্ভর ও বহুমুখী শিল্প সহযোগিতায় সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তিনি ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর, জাহাজ নির্মাণ, সামুদ্রিক শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডিজিটাল প্রযুক্তি ও উন্নত উৎপাদনশিল্পকে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে তুলে ধরেন।

এ ছাড়া ওষুধশিল্প, চিকিৎসা সরঞ্জাম, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, জ্বালানি, লজিস্টিকস এবং অবকাঠামো উন্নয়নেও কোরীয় বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়ে আলোচনা হয়।

যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে সম্মতি

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সিদ্ধান্ত।

এই ওয়ার্কিং গ্রুপের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ খাত চিহ্নিত করা, ব্যবসা পরিচালনার প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিগত সংস্কারের উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হবে।

পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (PPP) আওতায় অবকাঠামো ও শিল্প প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হবে।

দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী বাংলাদেশে কার্যরত কোরীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন সমস্যা ও উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। এসব বিষয়ে পর্যালোচনা ও পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য কোরীয় পক্ষ একটি সমন্বিত তালিকা বাংলাদেশকে সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছে।

হুন্দাই গ্লোভিসের সঙ্গে বন্দর ও লজিস্টিকস উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা

বাংলাদেশে আধুনিক লজিস্টিকস হাব, বন্দর অবকাঠামো এবং অটোমোবাইল সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান Hyundai Glovis-এর সঙ্গে আলোচনা করেছে প্রতিনিধিদল।

প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট লি কিউ-বক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল, মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল এবং স্মার্ট লজিস্টিকস খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা হয়।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক

বাণিজ্যে বন্দরগুলোর সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক লজিস্টিকস সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

হুন্দাই গ্লোভিস বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় প্রকল্পগুলো পর্যালোচনায় আগ্রহ প্রকাশ করেছে। দুই পক্ষ সম্ভাব্য সহযোগিতা এগিয়ে নিতে কর্মপর্যায়ের দল গঠনের বিষয়ে একমত হয়েছে।

হানহয়া ওশানের সঙ্গে জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতে সহযোগিতা

দক্ষিণ কোরিয়ার জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান Hanwha Ocean-এর সঙ্গে বাংলাদেশের জাহাজ মেরামত, ড্রাই-ডকিং, সামুদ্রিক অবকাঠামো এবং জাহাজ নির্মাণশিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটি প্রাথমিকভাবে জাহাজ মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে সহযোগিতা শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছে।

পরবর্তী পর্যায়ে উন্নত প্রযুক্তির জাহাজ নির্মাণ এবং অন্যান্য সামুদ্রিক শিল্পে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরকারী অবকাঠামো বা FSRU প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

দুই পক্ষ আরও কারিগরি আলোচনা এবং পরবর্তী সফরের মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।

স্যামসাংয়ের সঙ্গে ইলেকট্রনিকস, AI ও ডিজিটাল প্রযুক্তি নিয়ে বৈঠক

বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Samsung Electronics-এর প্রেসিডেন্ট কিম উ-জুন ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল।

বৈঠকে ইলেকট্রনিকস উৎপাদন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল কানেক্টিভিটি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়।

আমির খসরু বাংলাদেশে স্যামসাংয়ের কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ও সেবা খাতে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা বিবেচনার আহ্বান জানান।

কোরীয় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকেও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সুযোগ অনুসন্ধানে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে।

LG AI Research পরিদর্শনের কর্মসূচি

দক্ষিণ কোরিয়া সফরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

সফরসূচি অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের LG AI Research এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান FuriosaAI পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।

এসব সফরের মাধ্যমে AI গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্পপ্রযুক্তিতে পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাবনা পর্যালোচনার কথা রয়েছে।

শুল্ক সংস্কার ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের উদ্যোগ

কোরীয় বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়নে চলমান সংস্কার উদ্যোগ তুলে ধরেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী।

তিনি জানান, বিনিয়োগের মূলধন ও মুনাফা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করা, ইলেকট্রনিকস শিল্পের কাঁচামালের শুল্ক কমানো এবং বন্দর ও কাস্টমস কার্যক্রম সহজ করার বিষয়ে সরকার কাজ করছে।

ইলেকট্রনিকস শিল্পের নির্দিষ্ট কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ২৬ শতাংশ থেকে শূন্যে নামিয়ে আনার উদ্যোগের কথাও কোরীয় পক্ষকে জানানো হয়।

সরকারি পর্যায়ে সহযোগিতার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ ও যৌথ উদ্যোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

প্রতিনিধিদলে ছিলেন যাঁরা

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী।

এ ছাড়া ইআরডি ও বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বৈঠকে অংশ নেন।

সিউল সফরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াচ্ছে।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নতুন সুযোগের প্রত্যাশা

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার এই আলোচনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের শিল্প খাতে নতুন প্রযুক্তি, বিদেশি বিনিয়োগ এবং দক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত, লজিস্টিকস এবং উন্নত উৎপাদনশিল্পে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনীতির বহুমুখীকরণে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে আলোচনায় আগ্রহ প্রকাশ এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পাদন এক বিষয় নয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত বিনিয়োগের পরিমাণ, প্রকল্পের সময়সীমা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা পরবর্তী আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, সেপা-পরবর্তী অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে বাস্তব বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং মানসম্মত কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্ট সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও দ্য কোরিয়া হেরাল্ড।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *