দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তি, ৯৭ শতাংশ পণ্যে অগ্রাধিকার সুবিধা

সংবাদ সারাদিন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৬ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৬ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি—কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট বা CEPA সই হয়েছে। এর মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ার উচ্চমূল্যের বাজারে বাংলাদেশের অধিকাংশ রপ্তানি পণ্যের জন্য অগ্রাধিকারমূলক শুল্কসুবিধা নিশ্চিত হওয়ার পথ তৈরি হলো।

মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট রাজধানীর বাংলাদেশ সচিবালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানের পর চুক্তির বিস্তারিত তুলে ধরেন বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়ো হান-কু। দুই দেশের মন্ত্রী চুক্তিটিকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন।

চুক্তির আওতায় দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে প্রবেশকারী বাংলাদেশি পণ্যের ৯৭ শতাংশ অগ্রাধিকারমূলক শুল্কসুবিধা পাবে। বিপরীতে, বাংলাদেশে রপ্তানি করা দক্ষিণ কোরিয়ার ৮৭ শতাংশ পণ্যের জন্য একই ধরনের বাজারসুবিধা দেওয়া হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার সুবিধাপ্রাপ্ত পণ্যের তালিকায় নির্বাচিত কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক সামগ্রী এবং সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আমদানি করা যন্ত্র বা যানবাহনের যন্ত্রাংশ—CKD পণ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, CEPA কার্যকর হওয়ার পর বাংলাদেশের ৮ হাজার ৪২৮টি পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ায় তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা পাবে। এসব পণ্যের মধ্যে তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা, পাট ও পাটজাত পণ্যসহ বাংলাদেশের প্রধান ও সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতের পণ্য রয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য পাওয়া এই সুবিধা দেশের রপ্তানি খাতের জন্য একটি বড় অর্জন। তাঁর মতে, চুক্তিটি বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার ও পণ্য বহুমুখীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি জানান, CEPA-এর মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সেমিকন্ডাক্টর, তথ্যপ্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ এবং হালকা প্রকৌশলের মতো উচ্চমূল্যের শিল্পে বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের স্থানীয় শিল্পের স্বার্থ বিবেচনায় রেখেই চুক্তির শর্তগুলো চূড়ান্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

পণ্য বাণিজ্যের পাশাপাশি সেবা খাতেও দুই দেশ পরস্পরকে বাজারসুবিধা দিতে সম্মত হয়েছে। চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ দক্ষিণ কোরিয়াকে ৯৫টি সেবা উপখাতে প্রবেশের সুযোগ দেবে। বিপরীতে, দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের জন্য ১১১টি সেবা উপখাত উন্মুক্ত করবে। এতে বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তির অংশগ্রহণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং সেবাভিত্তিক বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়ো হান-কু বলেন, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে মূলত বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। নতুন চুক্তির মাধ্যমে সেই সম্পর্ক প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা, উৎপাদন এবং বিনিয়োগের নতুন খাতে সম্প্রসারিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি বাংলাদেশের তরুণ ও বৃহৎ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, কোরীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন করে দক্ষিণ কোরিয়ার পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারেও পণ্য রপ্তানি করতে পারবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৩৯ কোটি ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ৪৯ কোটি ১৭ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করে এবং দেশটি থেকে প্রায় ৯০ কোটি ২৯ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করে। ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৪১ কোটি ১০ লাখ ডলার।

বাংলাদেশ বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় তৈরি পোশাক, হোম টেক্সটাইল, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা, ওষুধ, পাটজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য ও সিরামিক পণ্য রপ্তানি করে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি, লোহা ও ইস্পাত, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, প্লাস্টিক, রাসায়নিক ও কাগজজাত পণ্য আমদানি করা হয়।

দুই দেশের CEPA আলোচনার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের নভেম্বরে। ২০২৫ সালের আগস্টে সিউলে প্রথম দফার আনুষ্ঠানিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ায় মোট পাঁচ দফা আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পাশাপাশি প্রধান আলোচকদের মধ্যে প্রায় ৪০টি অনলাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পণ্য, সেবা, শুল্কসুবিধা, উৎপত্তিবিধি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে গঠিত কারিগরি দলগুলো আলোচনায় অংশ নেয়।

২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রেক্ষাপটে চুক্তিটিকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। উত্তরণের পর বিভিন্ন বাজারে বিদ্যমান একতরফা শুল্কসুবিধা ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার আশঙ্কার মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বড় বাজারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।

তবে শুধু শুল্কসুবিধা পেলেই দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাপকভাবে বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন, নকশা উন্নয়ন, মান নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত সরবরাহ এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বন্দর, কাস্টমস ও সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা উন্নত করা প্রয়োজন।

চুক্তির পূর্ণাঙ্গ দলিল প্রকাশের পর কোন পণ্যে কী পরিমাণ শুল্ক কমবে, কোন পণ্যের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে সুবিধা কার্যকর হবে এবং উৎপত্তিবিধির শর্ত কী থাকবে—এসব বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানা যাবে। প্রাথমিক ঘোষণায় চুক্তিটি ঠিক কোন তারিখ থেকে কার্যকর হবে, তা উল্লেখ করা হয়নি। বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য চুক্তিটি প্রকাশ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *