গ্যাসের ঘাটতি ও এলএনজির উচ্চমূল্যের ধাক্কা: বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফের কয়লার ওপর বড় বিনিয়োগের পথে সরকার 

সংবাদ সারাদিন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬  

দেশের অভ্যন্তরে প্রাকৃতিক গ্যাসের দ্রুত হ্রাসপ্রাপ্ত মজুদ, আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির আকাশচুম্বী দাম এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সংকটের কারণে জ্বালানি সরবরাহে তৈরি হওয়া চরম অনিশ্চয়তা কাটাতে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে আবারও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে সরকার। এর অংশ হিসেবে নতুন করে ২ হাজার ৬৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের মাতারবাড়ী এবং পটুয়াখালীর পায়রায় এই দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি বৈদেশিক ও দেশীয় বিনিয়োগের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে শুধু মাতারবাড়ীতে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের সম্প্রসারণ প্রকল্পটিতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১.৫৬ বিলিয়ন ডলার।

সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় গ্যাস ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এমতাবস্থায় গ্যাস ও তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তুলনামূলক স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। বিসিপিসিএল-এর তৈরি করা মাতারবাড়ী সম্প্রসারণ প্রকল্পের ডিপিপি অনুযায়ী, আগে থেকেই বিদ্যুৎ সঞ্চালনের অবকাঠামো থাকায় এই স্থানে নতুন ইউনিট স্থাপনের কাজ দ্রুত শুরু করা সম্ভব হবে এবং বিদেশি অর্থায়ন না পাওয়া গেলে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নেও এটি বাস্তবায়নের বিকল্প রাখা হয়েছে। এছাড়া পায়রায় আরও ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের দ্বিতীয় পর্যায়ের কেন্দ্রটি বাস্তবায়নে চীনা এক্সিম ব্যাংকের সহায়তার চেষ্টা চলছে। বর্তমানে দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ৬ হাজার ৬৯০ মেগাওয়াট রয়েছে, যা নতুন এই দুই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৯ হাজার ৩৩০ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে।

আমদানিনির্ভর কয়লার ওপর চাপ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেবল বিদেশ থেকে কয়লা আনাই নয়, বরং দেশের নিজস্ব কয়লা উত্তোলনের ওপরও নতুন করে জোর দেওয়া হচ্ছে। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় লোকজনের সামাজিক সম্মতি ও পরিবেশগত বিষয়গুলো সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী এবং বড়পুকুরিয়ার নতুন প্রায় ৩০০ একর এলাকায় দেশীয় কয়লা উত্তোলনের প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। তবে ওপেন-পিট মাইনিংয়ের ক্ষেত্রে পুনর্বাসন, কৃষি ও পরিবেশগত ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকির বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখার তাগিদ দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে বর্তমান প্রশাসন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *