সংবাদ সারাদিন ডেস্ক | ঢাকা | ৩ নভেম্বর ২০২৬
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় উন্নত বিশ্বের কাছ থেকে ঋণের পরিবর্তে অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন এবং প্রধান কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি নিয়ে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১-এ অংশ নিতে তুরস্ক সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আগামী ১১ ও ১২ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী ‘ওয়ার্ল্ড লিডার্স ক্লাইমেট অ্যাকশন সামিট’-এ অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
সোমবার (২ নভেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
তিনি জানান, এবারের সফর অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হবে। প্রধানমন্ত্রী মূলত সম্মেলনের দুই দিনের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে অংশ নেবেন।
৯ নভেম্বর শুরু হচ্ছে কপ৩১ সম্মেলন
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের (ইউএনএফসিসিসি) ৩১তম সম্মেলন কপ৩১ আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়া এক্সপো সেন্টারে অনুষ্ঠিত হবে।
সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, জলবায়ুবিষয়ক নীতিনির্ধারক, আন্তর্জাতিক সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।
আগামী ১১ ও ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বনেতাদের বিশেষ জলবায়ু সম্মেলন।
এবারের সম্মেলনে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির বাস্তবায়ন, জলবায়ু অভিযোজন, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
ঋণ নয়, অনুদান চায় বাংলাদেশ
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে ঋণের পরিবর্তে অনুদান দেওয়ার পক্ষে অবস্থান তুলে ধরবে।
তাঁর মতে, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশকে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য তুলনামূলকভাবে কম দায়ী দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত ঋণের বোঝা চাপানো ন্যায্য নয় বলে মনে করছে বাংলাদেশ।
এ কারণে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সহজলভ্য, পর্যাপ্ত ও অনুদানভিত্তিক অর্থায়নের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরা হবে।
বড় কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর জবাবদিহির দাবি
কপ৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হবে বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট সৃষ্টিতে বড় কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর দায়িত্ব ও জবাবদিহি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু চুক্তির অধীনে উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর প্রতি তাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি বাংলাদেশ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হবে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি, দুর্যোগ প্রস্তুতি, অভিযোজন এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছে।
সরকারের ছয় মাসের পরিবেশগত উদ্যোগ তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী
শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, গত ছয় মাসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের গৃহীত পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক বিভিন্ন উদ্যোগ সম্মেলনে তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে খাল খনন, ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ।
সরকারের পক্ষ থেকে এসব কর্মসূচিকে পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হবে।
এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়া ও বৃহত্তর এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মানুষ কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে, সেটিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরা হবে।
জলবায়ু ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
ভৌগোলিক অবস্থান, ঘনবসতি এবং নদীনির্ভর অর্থনীতির কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, উপকূলীয় দুর্যোগ, নদীভাঙন এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জীবন ও জীবিকায় ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষি, নিরাপদ পানি, বসতি ও জীবিকার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন কর্মসূচি প্রয়োজন।
এ অবস্থায় জলবায়ু অর্থায়ন শুধু পরিবেশগত বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
তুরস্ক আয়োজন করবে, আলোচনায় নেতৃত্ব দেবে অস্ট্রেলিয়া
এবারের কপ৩১ সম্মেলনের আয়োজক দেশ তুরস্ক। সম্মেলনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন তুরস্কের পরিবেশ, নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী মুরাত কুরুম।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনার সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস বোয়েন।
দুই দেশের এই দায়িত্ব ভাগাভাগির ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক আয়োজন ও আন্তর্জাতিক দরকষাকষির প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে।
সফরসূচি জানানো হবে আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে
প্রধানমন্ত্রীর সফরের নির্দিষ্ট তারিখ, সফরসঙ্গীদের তালিকা এবং সম্মেলনে বাংলাদেশের বিস্তারিত আলোচ্যসূচি সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, সফরের আগে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করা হবে।
সেখানেই সফরের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে।
কপ৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন এবং জলবায়ু ন্যায্যতার দাবি তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে বাংলাদেশের উত্থাপিত দাবিগুলো কতটা আন্তর্জাতিক সমর্থন পাবে এবং সম্মেলন থেকে কী ধরনের সিদ্ধান্ত আসবে, তা নির্ভর করবে বহুপক্ষীয় আলোচনার ফলাফলের ওপর।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), ইউএনএফসিসিসি এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের বক্তব্য।


