সংবাদ সারাদিন ডেস্ক | ঢাকা | ২ নভেম্বর ২০২৬
দেশের রপ্তানি আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ৬ শতাংশ। একই সময়ে প্রবাসী আয় বেড়েছে ১৩ শতাংশ। এর মধ্যে নভেম্বরের শুরুতে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ১ নভেম্বর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬ হিসাবপদ্ধতিতে দেশের রিজার্ভের পরিমাণ ৩১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার।
রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার জোগানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
চার মাসে রপ্তানি আয় ১৭ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার
বাংলাদেশ ব্যাংকের পণ্যভিত্তিক রপ্তানি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসে বাংলাদেশ ১৭ দশমিক ০৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।
গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৬ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৯৬ কোটি ডলার, যা শতকরা হিসাবে প্রায় ৬ শতাংশ।
দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্প এ প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে। তবে পোশাক খাতের পাশাপাশি পাট, চামড়া, রাসায়নিক পণ্য ও অন্যান্য কয়েকটি খাতেও রপ্তানি বেড়েছে।
তৈরি পোশাক খাতেই রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি
জুলাই–অক্টোবর সময়ে নিটওয়্যার রপ্তানি ৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে ওভেন পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৬ বিলিয়ন ডলার।
এ দুই খাতের সম্মিলিত রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার, যা মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চার মাসে সামগ্রিক রপ্তানি বৃদ্ধির প্রায় ৮১ শতাংশ এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে।
ফলে দেশের রপ্তানি অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের শক্তিশালী অবস্থান অব্যাহত রয়েছে।
পাট, চামড়া ও রাসায়নিক পণ্যেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি
তৈরি পোশাকের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি পোশাকবহির্ভূত রপ্তানি খাতেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
জুলাই থেকে অক্টোবর সময়ে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ কোটি ৩০ লাখ ডলারে।
একই সময়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ১২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৪৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে রাসায়নিক পণ্যের রপ্তানি ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
হোম টেক্সটাইল খাতে রপ্তানি বেড়েছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং পাদুকা খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ।
এ ছাড়া পরচুলা ও মানুষের চুলের তৈরি পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৮৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
এসব পরিসংখ্যান পোশাকবহির্ভূত কয়েকটি শিল্পের রপ্তানি সক্ষমতা সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কৃষিপণ্য ও মৎস্য রপ্তানিতে নেতিবাচক ধারা
বিভিন্ন খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের রপ্তানি কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে কৃষিপণ্য রপ্তানি কমেছে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ রপ্তানি কমেছে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং তুলা ও তুলাজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে ১০ দশমিক ২ শতাংশ।
এ ছাড়া কাগজ ও কাগজজাত পণ্যের রপ্তানি ১৮ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে।
সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির মধ্যেও এসব খাতের নেতিবাচক পরিস্থিতি রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং খাতভিত্তিক প্রতিবন্ধকতা দূর করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
অক্টোবরে রেমিট্যান্স এসেছে ২৮৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার
রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবর মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ২৮৭ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার।
গত বছরের একই মাসে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৫৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার। সে হিসাবে অক্টোবরে প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ।
তবে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও অক্টোবরসহ টানা পাঁচ মাস মাসিক রেমিট্যান্স প্রবাহ ৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং প্রবাসীদের আয় ও ব্যয়ের ওপর চাপের কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
চার মাসে প্রবাসী আয় ১১ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার
চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে পাঠিয়েছেন ১১ দশমিক ৪৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
গত অর্থবছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ১০ দশমিক ১৪৯ বিলিয়ন ডলার।
সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ১ দশমিক ৩১৬ বিলিয়ন ডলার বা ১৩ শতাংশ।
প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এই অর্থ দেশের আমদানি ব্যয় পরিশোধ, বৈদেশিক লেনদেন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় সহায়ক ভূমিকা রাখে।
রিজার্ভ ৩৬ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার, বিপিএম৬ হিসাবে ৩১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১ নভেম্বর দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
তবে আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করলে রিজার্ভের পরিমাণ ৩১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার।
এর আগে ২৬ অক্টোবর মোট রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম৬ পদ্ধতিতে ছিল ৩১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার। ফলে সাম্প্রতিক কয়েক দিনে রিজার্ভ কিছুটা কমলেও তা ৩৬ বিলিয়ন ডলারের ওপরে রয়েছে।
রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। তবে রিজার্ভের প্রকৃত অবস্থান নির্ভর করে আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক লেনদেনের ওপরও।
অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রবণতা ধরে রাখাই এখন চ্যালেঞ্জ
চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসের পরিসংখ্যানে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স—দুই গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎসেই প্রবৃদ্ধির চিত্র পাওয়া গেছে।
তবে তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো, কৃষি ও মৎস্য রপ্তানির নেতিবাচক প্রবণতা মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন ক্রেতা ও বিনিয়োগ আকর্ষণ করা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে প্রবাসীদের বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করা, রপ্তানি আয়ের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের চলমান ইতিবাচক ধারা ধরে রাখা গেলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।


