পোশাকশিল্পে অস্থিরতা: ক্রয়াদেশ হারানোর শঙ্কা, ২৪ ঘণ্টায় আন্দোলন থামার আশা শ্রমিক নেতাদের

Table of content

Table of content

সংবাদ সারাদিন ডেস্ক | ঢাকা | ২ নভেম্বর ২০২৬

দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে টানা শ্রমিক অসন্তোষ, সড়ক অবরোধ ও সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। চলমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে পোশাকের ক্রয়াদেশ অন্য দেশে সরিয়ে নিতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা। একই সঙ্গে আন্দোলনে আটক শ্রমিক ও নেতাদের মুক্তি, হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার এবং আলোচনার ভিত্তিতে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।

সোমবার (২ নভেম্বর) রাজধানীর শ্রম ভবনে নতুন গঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধিদের আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিক প্রতিনিধিরা জানান, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন শ্রমিক ফেডারেশন ও সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে একটি ঐকমত্যভিত্তিক প্রস্তাব তৈরি করা হবে।

পাশাপাশি শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণভাবে কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার আশা প্রকাশ করেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আন্দোলন অনেকটাই বন্ধ হয়ে আসবে এবং কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে।

১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবি

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। তা বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন চলছে।

শ্রমিকদের অভিযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সেই তুলনায় তাঁদের আয় বাড়েনি। এর পাশাপাশি অন্যায্য ছাঁটাই, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে প্রতিবন্ধকতা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে।

দাবি আদায়ে বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ, যানবাহন ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

সহিংসতায় বহিরাগতদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ

শ্রমিক নেতাদের দাবি, আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সব সহিংসতার জন্য সাধারণ শ্রমিকদের দায়ী করা ঠিক হবে না।

তাঁরা অভিযোগ করেন, কিছু স্থানে আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে বহিরাগত ব্যক্তিরা ভাঙচুর ও সহিংসতায় অংশ নিয়েছেন। এসব কর্মকাণ্ডে অর্থের বিনিময়ে লোক নিয়োগের অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন শ্রমিক প্রতিনিধি।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি।

সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে হোপ মার্কেটের আন্দোলনরত ফুটপাতের ব্যবসায়ীরাও যুক্ত হয়েছেন। অন্যদিকে গাজীপুরে স্থানীয় কিছু মানুষও বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন বলে জানান তিনি।

শ্রমিক প্রতিনিধিরা বলেন, যাঁরা প্রকৃতপক্ষে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা হামলার সঙ্গে জড়িত, তাঁদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তবে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাধারণ শ্রমিকরা যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

বিদেশি ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ হারানোর শঙ্কা

শ্রমিক নেতাদের মতে, পোশাক খাতের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বাংলাদেশি কারখানাগুলোর ওপর আস্থা কমতে পারে। ফলে নতুন ক্রয়াদেশ অন্য প্রতিযোগী দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রোববারের শ্রমিক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের কারণে মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ৫২৯টি কারখানায় এক দিনের জন্য উৎপাদন বন্ধ রাখা হয় বলে বিজিএমইএর পরিস্থিতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সোমবার কিছু কারখানায় উৎপাদন আবার শুরু হলেও গাজীপুরসহ কয়েকটি এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ অব্যাহত ছিল।

শ্রমিক নেতারা বলছেন, শিল্পের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণের উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ শ্রমিকদের অসন্তোষের কার্যকর সমাধান ছাড়া পোশাক খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন।

আটক শ্রমিকদের মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের দাবি

সংবাদ সম্মেলনে চলমান মজুরি আন্দোলনের কারণে আটক শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানানো হয়।

একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার এবং শ্রমিকদের চাকরিচ্যুতি, কালো তালিকাভুক্তি কিংবা অন্য কোনো প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করার আহ্বান জানান তাঁরা।

মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার আটক শ্রমিক নেতাদের নির্যাতন না করা এবং দ্রুত মুক্তির দাবি জানান।

তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের পরিস্থিতি সোমবার অনেকটাই কমেছে। মঙ্গলবারের মধ্যে তা প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে বলে তিনি আশা করছেন।

জানুয়ারির মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের দাবি

শ্রমিক প্রতিনিধিরা আগামী জানুয়ারির মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।

তাঁরা বলেন, নতুন মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে কেবল মালিকপক্ষের সক্ষমতা নয়, শ্রমিকদের বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, পরিবারের মৌলিক চাহিদা এবং শিল্পের সামগ্রিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।

ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, সব শ্রমিক ফেডারেশন, কারখানাভিত্তিক ইউনিয়ন ও সাধারণ শ্রমিকদের মতামত নিয়ে যৌথভাবে একটি গ্রহণযোগ্য মজুরি প্রস্তাব তৈরি করা হবে।

ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন

চলমান শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে রোববার (১ নভেম্বর) সরকার তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য ছয় সদস্যের নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে।

বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান।

এ ছাড়া বোর্ডে নিরপেক্ষ সদস্য, মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার।

বোর্ডের মাধ্যমে নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি চূড়ান্ত করা হয়নি।

শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরাতে আলোচনা

এদিকে তৈরি পোশাকশিল্পের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে সোমবার সকালে সচিবালয়ে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

বৈঠক শেষে তিনি জানান, শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা এবং শিল্পাঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

কোনো কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হোক, তা সরকার চায় না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে শ্রমিক প্রতিনিধিরা বলছেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা—দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁদের প্রত্যাশা, সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত বর্তমান সংকটের সমাধান হবে এবং দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।

তথ্যসূত্র: শ্রমিক প্রতিনিধিদের সংবাদ সম্মেলনসংক্রান্ত প্রতিবেদন, বাসস, রয়টার্স, জাগো নিউজ ও ইউএনবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *