রামপালে সিমেন্ট ডিপোর ভেতরে শতাধিক হরিণ বন্দি! রাতের আঁধারে জবাই করে মাংস বিক্রির অভিযোগ, দখল হয়েছে সরকারি খালও

মো: আল-মাহফুজ শাওন

বাগেরহাটের রামপালে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের পাশে দুবাই বাংলাদেশ সিমেন্ট কোম্পানির একটি ডিপো ঘিরে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। ডিপোর সীমানাপ্রাচীরের ভেতরে শতাধিক বন্য হরিণ আটকে রেখে অবৈধভাবে লালন-পালন করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, রাতের আঁধারে এসব হরিণের মধ্য থেকে বেছে বেছে জবাই করে মাংস বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

একই সঙ্গে ডিপো নির্মাণের জন্য সরকারি রেকর্ডভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ঠালনতলা খাল’ দখল ও ভরাটের অভিযোগও উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র ডিপোর ভেতরে গোপনে হরিণ আটকে রেখে এই কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। গভীর রাতে ব্যক্তিগত গাড়িতে করে হরিণ বের করে মোংলার নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে জবাই করা হয়। পরে গোপনে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয় সেই মাংস।

অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গণমাধ্যমকর্মীরা ডিপোতে গেলে প্রধান ফটকেই বাধার মুখে পড়েন। দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মীরা ভেতরে হরিণ থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেন।

তবে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসার পর রামপাল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অভিজিৎ চক্রবর্তী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে ডিপোর ভেতরে হরিণ পালনের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার কথা জানান তিনি। সরকারি খাল ভরাট কিংবা খালের ওপর অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

এদিকে, ডিপোসংলগ্ন সরকারি রেকর্ডভুক্ত ঠালনতলা খাল দখল ও ভরাটের অভিযোগে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। তাদের দাবি, একসময় খালটি এলাকার কৃষিকাজ ও পানি নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল। কিন্তু খাল ভরাট এবং এর ওপর পাকা গেট নির্মাণের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে কৃষিজমিতে পানি প্রবেশ ও স্বাভাবিক কৃষিকাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মৎস্য খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয় জামায়াত যুব বিভাগের নেতা মোহাম্মদ খলিলুল্লাহ বলেন, কোম্পানির ভেতরে শতাধিক হরিণ বন্দি করে রাখার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দ্রুত এসব বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে নিরাপদ আবাসস্থলে অবমুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি খাল দখলমুক্ত করে কৃষকদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানান তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ রাজু শেখ, প্রীতিস ও মাছচাষি মনি বলেন, খাল ভরাটের কারণে এলাকার কৃষি ও মৎস্য খাত হুমকির মুখে পড়েছে। হরিণ পালনের বৈধ অনুমতি থাকলে তা আইন মেনে পরিচালনা করতে হবে। আর অনুমতি না থাকলে অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী আটকে রাখা ও জবাইয়ের কার্যক্রম বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে দুবাই বাংলাদেশ সিমেন্ট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোঃ রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, সুন্দরবনের ৩০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে হরিণ চাষ বা লালন-পালন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রামপাল উপজেলা এ নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত। সেখানে হরিণ পালন, জবাই কিংবা মাংস বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের কর্মকাণ্ড দণ্ডনীয় অপরাধ।

একদিকে শতাধিক বন্য হরিণ বন্দি রাখার অভিযোগ, অন্যদিকে সরকারি খাল দখলের অভিযোগ—রামপালের এই ঘটনায় এখন এলাকাবাসীর প্রশ্ন, বন্যপ্রাণী সুরক্ষা ও সরকারি সম্পদ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ কবে দৃশ্যমান হবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *