সংবাদ সারাদিন ডেস্ক | ঢাকা | ৩ নভেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে দ্বিতীয় দফায় আরও তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের খবর পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) চার দিনের রিমান্ড শেষে তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নৌ-পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন তদন্তের স্বার্থে তাঁকে আরও সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন।
প্রাপ্ত আদালতসংক্রান্ত বিবরণ অনুযায়ী, উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাসান শাহাদাত দীপের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তিন দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।
প্রথম দফার জিজ্ঞাসাবাদে কী তথ্য পেয়েছে পুলিশ?
এর আগে শনিবার (৩১ অক্টোবর) দীপকে প্রথম দফায় চার দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দেন আদালত।
পুনরায় রিমান্ড আবেদনে পুলিশ দাবি করেছে, প্রথম দফায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় দীপ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তবে ঘটনার একাধিক বিষয়ে তিনি প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেছেন বলে দাবি তদন্ত কর্মকর্তার।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব তথ্য যাচাই এবং ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে তাঁকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
আটটি কারণ দেখিয়ে পুনরায় রিমান্ড আবেদন
তদন্ত কর্মকর্তা দ্বিতীয় দফায় রিমান্ড চাওয়ার পক্ষে আটটি কারণ উল্লেখ করেছেন।
এর মধ্যে রয়েছে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, তাহসিফ ও দীপের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড পর্যালোচনা এবং ঘটনার রাতে তাঁদের চলাচলের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ।
এ ছাড়া উত্তরার নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অবস্থানকালে দীপ ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্য অন্যত্র গিয়ে কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
পুলিশ মামলার অজ্ঞাতপরিচয় অন্য সন্দেহভাজনদের শনাক্ত, প্রয়োজনীয় আলামত উদ্ধার, মৃত্যুর কারণ ও সম্ভাব্য হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং ঘটনাস্থল নির্ধারণ করতে চাইছে।
টঙ্গীর মাজার বস্তিতে যাওয়ার তথ্য
রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে টঙ্গী পশ্চিম থানাধীন মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন দীপ।
পুলিশের দাবি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং অন্যান্য সূত্রের মাধ্যমে তাঁদের সেখানে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকা থেকে তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।
তবে ঘটনার রাতে সেখানে ঠিক কী হয়েছিল এবং তাহসিফ কীভাবে নদীতে পড়েছিলেন বা তাঁর মৃত্যু কীভাবে ঘটেছিল, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
নিখোঁজ হওয়ার আগে মাকে শেষ ভয়েস মেসেজ
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার পর দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হন তাহসিফ সৌরি।
রাত গভীর হলেও তিনি ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম এজাহারে উল্লেখ করেন, রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফের মেসেঞ্জার অ্যাকাউন্ট থেকে তাঁর মায়ের কাছে একটি ভয়েস মেসেজ আসে।
সেখানে বলা হয়, ‘রওনা দিয়েছি, আসছি।’
কিন্তু এরপর আর বাসায় ফেরেননি তাহসিফ।
পরদিন তুরাগ নদ থেকে মরদেহ উদ্ধার
২৮ অক্টোবর বিকেলে রাজধানীর উত্তরখান থানাধীন রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ।
পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে ২৯ অক্টোবর পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। ওই দিন বিকেলে উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
বাবার করা হত্যা মামলায় দীপ গ্রেপ্তার
তাহসিফের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় ৩০ অক্টোবর রাতে রাজধানীর উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন তাঁর বাবা কে এম এনায়েতুল করিম।
পরে মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে দীপকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।
তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, এখন পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য ও আলামতে দীপের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে এ বিষয়ে দীপের অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হয়নি। তাঁর আইনজীবীরা পুনরায় রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিনের আবেদন করেছেন।
রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্তের পরবর্তী ধাপ
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং ফরেনসিক আলামত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
দ্বিতীয় দফায় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে শেষ রাতের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করছে নৌ-পুলিশ।
তবে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে নিশ্চিত করার সুযোগ নেই।
তথ্যসূত্র: আদালতসংক্রান্ত প্রাপ্ত বিবরণ, বাংলা ট্রিবিউন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর, প্রথম আলো ও জাগো নিউজ।


