ট্রাম্পের এক সিদ্ধান্তেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম ছাড়াল ১০৫ ডলার: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনার আঁচ

সংবাদ সারাদিন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮  সেপ্টেম্বর | আপডেট: ২৮  সেপ্টেম্বর ২০২৬  

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটানো এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে তেহরানের তরফ থেকে পেশ করা একটি কূটনৈতিক শান্তি প্রস্তাব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক অপ্রত্যাশিতভাবে প্রত্যাখ্যান করার পরপরই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববাজারে বেঞ্চমার্ক অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও হু হু করে বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ মার্কিন ডলারের মাইলফলক ছাড়িয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার গভীর আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে, যার ফলেই তেলের বাজারে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ও বাজার পরিস্থিতির বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, সোমবার বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী সকাল পৌনে সাতটার দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে সামনের মাসগুলোতে সরবরাহের জন্য নির্ধারিত ব্রেন্ট ক্রুডের ভবিষ্যৎ মূল্য প্রতি ব্যারেল বেড়ে দাঁড়ায় ১০৫.৬৪ ডলারে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামও বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ৯৩.১১ ডলারে গিয়ে ঠেকে। মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের শান্তি উদ্যোগ ফিরিয়ে দেওয়ার পর থেকেই এই অঞ্চলে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা আরও তীব্র রূপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কায় একদিনেই তেলের দাম এক শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়। এর আগে গত সপ্তাহে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনের ফাঁকে কাতারের অভিজ্ঞ মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনে এই শান্তি প্রস্তাবটি পাঠায় ইরান। ওই প্রস্তাবে সামরিক সংঘাতের স্থায়ী অবসান এবং বিশ্ববাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। যদিও শনিবার ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি প্রস্তাবটি নাকচ করেছেন, তবে পরবর্তীতে রোববার অ্যাক্সিওসকে দেওয়া ফোনালাপে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে চলতি সপ্তাহেই মার্কিন আলোচক দল ইরানের সঙ্গে এ বিষয়ে আরও কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাবে।

এদিকে, গত সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সামান্য (০.৪ শতাংশ) বৃদ্ধি পেলেও যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই তেলের বাজারে বিপরীত চিত্র দেখা গিয়েছিল এবং এর দাম প্রায় ৭.৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল। মার্কিন অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির লাগাম টানতে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার জোরালো গুঞ্জন উঠলে ডব্লিউটিআইয়ের দামে বড় পতন ঘটেছিল, কারণ এমন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ তেল শোধনাগারগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। অন্য একটি ইতিবাচক ঘটনায় দেখা গেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের উৎপাদন ও সরবরাহ কিছুটা বৃদ্ধি করায় চলতি সেপ্টেম্বর মাসে এই অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বেড়ে দৈনিক ১ কোটি ২৮ লাখ ব্যারেলে উন্নীত হয়েছে। জ্বালানি ট্র্যাকিং সংস্থা কেপলারের প্রাথমিক সামুদ্রিক জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত উপাত্ত অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এটিই এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ মাসিক রপ্তানি রেকর্ড। হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার ও জাহাজ চলাচল আংশিক স্বাভাবিক হওয়ায় এই রপ্তানি বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। এর আগে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর নাশকতামূলক হামলায় সৌদি আরবের কৌশলগত পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটি লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল রপ্তানি কমিয়ে পূর্বাঞ্চলের মূল রাস তানুরা টার্মিনাল দিয়ে রপ্তানি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যার ফলেও বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে এই কাঠামোগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *