সংবাদ সারাদিন ডেস্ক | ঢাকা | ৫ নভেম্বর ২০২৬
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে চলমান পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ, উসকানি ও নাশকতার অভিযোগ সামনে এসেছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে প্রকাশিত খবরে দাবি করা হয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক কয়েকজন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন।
এ ছাড়া গাজীপুরে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মালিকানাধীন অন্তত ১০টি পোশাক কারখানার নাম গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম। অভিযোগ রয়েছে, এসব কারখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় ইন্ধন দিয়েছেন।
তবে সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোর নাম, তাদের বিরুদ্ধে সংগৃহীত সুনির্দিষ্ট আলামত কিংবা অভিযুক্তদের বক্তব্য প্রকাশ্যে না আসায় অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
পাঁচ শিল্পাঞ্চলে অনুপ্রবেশের অভিযোগ
ঢাকার মিরপুর, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জে গত এক সপ্তাহ ধরে ন্যায্য মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা ও অন্যান্য শ্রমিক অধিকার আদায়ের দাবিতে আন্দোলন চলছে।
এর মধ্যে কয়েকটি এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে প্রকাশিত সংবাদে দাবি করা হয়, আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা সৃষ্টিতে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি ভূমিকা রেখেছেন।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শ্রমিক সংগঠন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে আন্দোলনের মধ্যে নাশকতার অভিযোগের বিভিন্ন সূত্র পাওয়া গেছে।
তবে সব শ্রমিক বিক্ষোভ কিংবা সংঘর্ষের জন্য একটি রাজনৈতিক দল বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে দায়ী করার মতো পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।
গাজীপুরের ১০ কারখানা নিয়ে প্রশ্ন
গাজীপুরের অন্তত ১০টি পোশাক কারখানার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ উঠে আসায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
প্রকাশিত গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি কারখানার সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু শ্রমিক স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে চাইলেও তাঁদের আন্দোলনে অংশ নিতে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়ার বরাতে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, আন্দোলনে অংশ নেওয়া কিছু শ্রমিক তাঁদের অংশগ্রহণের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেননি।
তবে এসব অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সব শ্রমিক কিংবা কারখানাকে সহিংসতায় জড়িত বলা যায় না। অভিযোগের যথার্থতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য প্রয়োজন।
শ্রমিকের ছদ্মবেশে নাশকতার অভিযোগে গ্রেপ্তার
শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে নাশকতার অভিযোগে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ।
৩ নভেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের ৩৩ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ডিএমপির দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কেউ কেউ শ্রমিক পরিচয়ে আন্দোলনে অংশ নিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে তাঁদের কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অন্যদিকে একই দিনে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মুস্তাফিজুর রহমান বৃহত্তর অঞ্চলে আন্দোলনের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে ৪০ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানান। তাঁর দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা কেউই প্রকৃত পোশাকশ্রমিক নন।
তবে ডিএমপির ৩৩ জন এবং ঢাকা রেঞ্জ পুলিশের উল্লেখ করা ৪০ জন একই অভিযানের অংশ কি না, তা নিশ্চিত নয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার বিষয়টিও এখনো বাকি।
শ্রমিকদের মূল দাবি ৩০ হাজার টাকা মজুরি
রাজনৈতিক অনুপ্রবেশের অভিযোগের পাশাপাশি শ্রমিকদের মূল দাবিগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
বর্তমানে দেশের পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বাসাভাড়া, খাদ্য ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে শ্রমিকেরা তা ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি তুলেছেন।
এ ছাড়া অন্যায্য শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ, পুনর্বহাল, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার এবং বিভিন্ন শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিষয়েও দাবি রয়েছে।
এসব দাবির ভিত্তিতে শুরু হওয়া আন্দোলনের মধ্যেই কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
শ্রমিকনেতাদের একটি অংশ অভিযোগ করেছেন, ভাঙচুর ও নাশকতার সঙ্গে সাধারণ শ্রমিকদের সবাই জড়িত নন। তাঁদের দাবি, বহিরাগত ব্যক্তিদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা উচিত।
মজুরি বোর্ড গঠন, ডিসেম্বর থেকে নতুন কাঠামোর আশ্বাস
পরিস্থিতি সামাল দিতে ১ নভেম্বর নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বোর্ডের প্রথম সভায় মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর করার বিষয়ে একমত হন।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন কাঠামো চূড়ান্ত হলে শ্রমিকেরা আগামী জানুয়ারিতে ডিসেম্বর মাসের বর্ধিত মজুরি পেতে পারেন।
তবে নতুন ন্যূনতম মজুরি কত হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
ফলে মজুরি বোর্ড গঠিত হলেও শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকার মূল দাবি পূরণ হয়েছে—এমনটি বলা যাচ্ছে না।
গাজীপুরে কাজে ফিরছেন শ্রমিকেরা
এদিকে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকদের কাজে ফেরার খবর পাওয়া গেছে।
দীর্ঘ কয়েক দিনের আন্দোলন ও অস্থিরতার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
তবে মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া এবং বেশ কিছু দাবি নিষ্পত্তি না হওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি।
পোশাকশিল্পের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা ফেরানো এখন সংশ্লিষ্ট সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ন্যায়সংগত দাবি ও নাশকতার অভিযোগ আলাদাভাবে দেখার আহ্বান
পোশাকশিল্পে চলমান পরিস্থিতিতে দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে আলাদা করা জরুরি—শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলন এবং আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে সংঘটিত সম্ভাব্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।
কোনো ব্যক্তি সহিংসতায় জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সেই অভিযোগের কারণে সাধারণ শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার কিংবা ন্যায্য দাবিকে অস্বীকার করা সমীচীন নয়।
একইভাবে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে নাম আসার অর্থ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়।
এই পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগে নাম আসা ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ, শ্রমিকদের সঙ্গে কার্যকর সংলাপ এবং দ্রুত গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামো নির্ধারণের মাধ্যমে শিল্পাঞ্চলে স্থায়ী স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে আশা করা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), আরটিভি, ঢাকা পোস্ট, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও জাগো নিউজ।


