সংবাদ সারাদিন ডেস্ক | ঢাকা | ৫ নভেম্বর ২০২৬
দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ ও সহিংসতার পেছনে অর্থায়ন এবং জনবল সরবরাহের অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, প্রভাবশালী শিল্পমালিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসহ অন্তত ২০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশনা দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখতে দেশের ব্যাংকগুলোতে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে বলে রাজস্ব বোর্ডের একটি সূত্র জানিয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালিকায় অন্তত ১২টি শিল্পগোষ্ঠীর মালিকের নাম রয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিতে চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত কিছু সহিংস কর্মকাণ্ডে অর্থ ও জনবল দিয়ে সহায়তা করেছেন তাঁরা।
তবে অভিযোগগুলো এখনো তদন্তাধীন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপরাধের দায় বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হয়নি।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে শিল্পমালিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম
এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, ব্যাংক হিসাব জব্দের তালিকায় আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক কয়েকজন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম রয়েছে।
প্রকাশিত তালিকায় উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, বেক্সিমকো গ্রুপের সালমান এফ রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য সালাম মুর্শেদী, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এবং সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম।
এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম মান্নান কচিসহ কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তির নামও প্রকাশিত হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা হয়েছে।
এসব অভিযোগ যাচাইয়ের অংশ হিসেবেই আর্থিক লেনদেনের তথ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
তবে অভিযোগে নাম আসা ব্যক্তিদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তাঁদের মধ্যে কেউ কারাগারে এবং কেউ দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
ব্যাংকগুলোতে নির্দেশনা পাঠিয়েছে এনবিআর
রাজস্ব বোর্ডের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশনা ই-মেইলের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোতে পাঠানো হয়েছে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেন, অর্থের সম্ভাব্য উৎস এবং অভিযোগে উল্লিখিত অর্থায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগ যাচাই করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) ও আয়কর গোয়েন্দা বিভাগের মাধ্যমে ৩৪ ব্যক্তি এবং ৩৪টি পরিবারের ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগের কথা জানিয়েছিলেন।
তবে ওই উদ্যোগের সঙ্গে শ্রমিক আন্দোলনসংক্রান্ত বর্তমান তালিকার কতটা সম্পর্ক রয়েছে, তা পৃথকভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
ব্যাংক হিসাব জব্দের প্রশাসনিক পদক্ষেপকে অপরাধ প্রমাণের সমতুল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
গাজীপুরের ১০ কারখানা নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য
পোশাকশিল্পে অস্থিরতার বিষয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে গাজীপুরের অন্তত ১০টি কারখানার নাম উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এসব কারখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন।
কয়েকজন শ্রমিকের বক্তব্যেও অভিযোগ এসেছে, তাঁরা কর্মস্থলে কাজ করতে আগ্রহী হলেও আন্দোলনে অংশ নিতে চাপের মুখে পড়েছেন।
তবে কোন কারখানার বিরুদ্ধে কী ধরনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে এবং সেসব অভিযোগের সমর্থনে কী আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।
এ কারণে সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোর দায় নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি
এর আগে পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতার পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
২ নভেম্বর পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি দাবি করেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং কয়েকজন শিল্পমালিক শ্রমিক আন্দোলনকে ব্যবহার করে সহিংসতা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন।
৪ নভেম্বরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে বহিরাগত কিছু ব্যক্তি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন বলে সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে।
তিনি জানান, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বিবেচনায় সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে এসব বক্তব্য সরকারের অভিযোগ ও মূল্যায়ন। প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, তা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারণ করতে হবে।
মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন
দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে বর্তমানে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাসাভাড়া, পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকেরা ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আন্দোলন শুরু করেন।
রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
বেশ কয়েকটি এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ এবং কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
এসব ঘটনায় বহু শ্রমিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য আহত হয়েছেন।
এ ছাড়া উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় পোশাক রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকরের উদ্যোগ
শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে।
৪ নভেম্বরের আলোচনায় নতুন মজুরি কাঠামো ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, শ্রমিকেরা আগামী জানুয়ারিতে নতুন কাঠামো অনুসারে প্রথম বেতন পেতে পারেন।
তবে ন্যূনতম মজুরি কত টাকা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ফলে মজুরি বোর্ড গঠন করা হলেও শ্রমিকদের মূল দাবির আর্থিক নিষ্পত্তি এখনো বাকি রয়েছে।
এদিকে শ্রমিকনেতাদের একটি অংশ দ্রুত নতুন মজুরি নির্ধারণ, আটক শ্রমিকদের মুক্তি এবং হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
উৎপাদন ব্যাহত, রপ্তানি আদেশ হারানোর আশঙ্কা
চলমান শ্রমিক অসন্তোষ দেশের রপ্তানিনির্ভর পোশাকশিল্পে উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করেছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে কয়েক শ কারখানার উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে পণ্য সরবরাহের সময়সূচি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কয়েকটি বিদেশি ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে পরিস্থিতির অগ্রগতি জানতে চেয়েছে বলে জানিয়েছেন রপ্তানিকারকেরা।
শিল্পমালিকদের আশঙ্কা, অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে কিছু ক্রয়াদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে সরে যেতে পারে।
তবে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং কারখানার উৎপাদন সচল রাখা—দুটি বিষয়কেই সমান গুরুত্ব দেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও শ্রমিকদের নিরাপত্তার দাবি
শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত সহিংসতা ও ভাঙচুরের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে জাতীয় মানবাধিকার পরিষদ।
সংগঠনটি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার আদায়ের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে সহিংসতার প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে।
অর্থায়নের অভিযোগ তদন্তের পাশাপাশি সাধারণ শ্রমিকদের বৈধ দাবি ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার যাতে ক্ষুণ্ন না হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
সামনে যে প্রশ্নগুলো
এনবিআরের ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগের পর এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা অর্থের প্রকৃত উৎস কী? কোনো আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে সহিংস কর্মকাণ্ডের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া গেছে কি? আর অভিযোগে নাম আসা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে আর্থিক তদন্ত, সংগৃহীত আলামত এবং পরবর্তী আইনি কার্যক্রমের ওপর।
পাশাপাশি শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবির গ্রহণযোগ্য সমাধান, শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যসূত্র: সমকালের এনবিআর সূত্রভিত্তিক প্রতিবেদন, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), রয়টার্স, প্রথম আলো ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।


