অর্থনীতি ডেস্ক | সংবাদ সারাদিন
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে শুধু শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধার ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমুখী বাণিজ্য কৌশল গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁদের মতে, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা বাড়তি তিন বছর পিছিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতির সুযোগ পেয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), পণ্যের বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশের মোট পণ্য রফতানির ৪৩ দশমিক ২৫ শতাংশ যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ বাজারে বাংলাদেশের রফতানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এ রফতানির প্রায় ৯২ শতাংশই তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। ফলে একটি নির্দিষ্ট খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের রফতানি বাণিজ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদরা।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ‘বৈশ্বিক সংকট, অর্থনৈতিক একীভূতকরণ এবং বাংলাদেশ-ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি’ শীর্ষক এক আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে। আলোচনায় অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদরা বলেন, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে জিএসপি প্লাস সুবিধার ওপর এককভাবে নির্ভর করা যথেষ্ট হবে না। বরং ইইউর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে বাজারে প্রবেশাধিকার ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের নিশ্চয়তা বাড়াতে পারে।
আলোচনায় অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বাইরেও চামড়া, ওষুধশিল্প, কৃষিপণ্য ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে রফতানি সম্প্রসারণের উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি খাতও বৈশ্বিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব খাতের উন্নয়ন হলে রফতানি আয় বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। তাঁর মতে, এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে যাওয়ার কারণে পাওয়া অতিরিক্ত সময় এফটিএ নিয়ে প্রস্তুতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, এলডিসি উত্তরণের জন্য পাওয়া বাড়তি তিন বছরকে প্রস্তুতির সময় হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। এ জন্য বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার জরুরি। রফতানি খাতকে প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই করতে না পারলে ভবিষ্যতে জিএসপি প্লাস সুবিধা নিয়েও ঝুঁকিতে পড়তে পারে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক দরকষাকষি জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যে শুল্কসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। ভূরাজনৈতিক বিভক্তি ও আন্তর্জাতিক সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অনিশ্চিত। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৫৭ শতাংশ আমদানিনির্ভর। অন্যদিকে, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা অনেকাংশে রফতানি আয় ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল। এ অবস্থায় রফতানি বাজারে নতুন শুল্ক বা বাণিজ্যিক বাধা তৈরি হলে দেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
আলোচনায় আরও বলা হয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের এভরিথিং বাট আর্মস (ইবিএ) ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশ বর্তমানে ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। তবে এলডিসি উত্তরণের পর এ সুবিধার ধারাবাহিকতা ও শর্তে পরিবর্তন আসতে পারে। এ পরিস্থিতিতে ইইউর সঙ্গে এফটিএ হলে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পর্কের পাশাপাশি বিনিয়োগ, সেবা খাতের সম্প্রসারণ এবং ইউরোপের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু বাণিজ্য চুক্তি করলেই বাংলাদেশের রফতানি খাতের ঝুঁকি দূর হবে না। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, শ্রমিকদের অধিকার ও কর্মপরিবেশ উন্নয়ন এবং পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে তৈরি পোশাকের বাইরে সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
সব মিলিয়ে, এলডিসি উত্তরণের বাড়তি সময়কে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যনীতি, উৎপাদন সক্ষমতা ও রফতানি কাঠামোয় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে পারলে ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। অন্যথায় একটি নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা ভবিষ্যতে রফতানি আয়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।


