বয়সকে হার মানিয়ে ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস নীলফামারীর শেফালী বেগম

সেলিম রেজা,নীলফামারী


“শিক্ষার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই, বয়স কেবলই একটি সংখ্যা”এই প্রবাদের বাস্তব রূপ দিলেন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকার গৃহবধূ শেফালী বেগম।

শৈশবে বাবাকে হারিয়ে সংসারের জোঁয়ালে থমকে যাওয়া লেখাপড়া দীর্ঘ দশক পর নতুন করে শুরু করে ৫২ বছর বয়সে তিনি এইচএসসি (বিজনেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি) পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২১ অর্জন করেছেন। তার এই সাফল্যে কেবল তার পরিবার নয়, পুরো এলাকায় বইছে আনন্দের জোয়ার।


শনিবার প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, ডোমার উপজেলার গোমনাতি টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে শেফালী বেগম মূল জিপিএ ৩.৯৬ এবং ঐচ্ছিক বিষয়সহ মোট জিপিএ ৪.২১ পেয়ে সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন।


ছোটবেলায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় বরাবরই মেধাতালিকায় স্থান পেতেন শেফালী বেগম। কিন্তু শৈশবে বাবাকে হারানোর পর নেমে আসে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট। পরিবারের টানাপোড়েন আর সংসারের কঠোর বাস্তবতায় বাধ্য হয়ে বই-খাতা বিসর্জন দিতে হয় তাকে। পরবর্তীতে স্বামী, সংসার ও সন্তান লালন-পালনের দায়িত্বে নিজের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন চাপা পড়ে গেলেও মনের ভেতর জ্বলছিল পড়াশোনার তীব্র আগুন। অবশেষে সব বাধা ও সমাজের কুণ্ঠা পেরিয়ে সেই ঘুমিয়ে থাকা স্বপ্নকে সত্যি করতেই ৪৮ বছর বয়সে নতুন করে পথচলা শুরু করেন তিনি।


দীর্ঘ বিরতির পর পড়াশোনা শুরু করার ক্ষেত্রে স্বামী মকছেদুল আলম মজনু ও সন্তানরা যুগিয়েছেন অদম্য সাহস ও অনুপ্রেরণা। শেফালীর এই সফলতার পেছনের কারিগরদের সহযোগিতায় তিনি কেবল নিজেই সফল হননি, সন্তানদেরও গড়ে তুলেছেন মানুষের মতো মানুষ করে।

তার ছোট ছেলে আব্দুর রাজ শাফি দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনা করছেন, মেয়ে মাকছুরা খানম নাসমুন রংপুর সরকারি কলেজে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত এবং বড় ছেলে আব্দুর রাজ্জাক ডিমলায় ব্যবসা করছেন।

পারিবারিক জীবনের বহু দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বড় ছেলের বিয়ে দিয়ে তিনি পুত্রবধূর শাশুড়ি এবং এক নাতনির দাদিও হয়েছেন। শেফালীর এই অসামান্য সাফল্যে গর্বিত তার কৃষক স্বামী মকছেদুল আলম মজনু ও চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া নাতনি শারাফি রাজ।

নাতনি শারাফির ভাষায়, “দাদির এই সাফল্য আমাকে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে আরও বেশি উৎসাহিত করেছে।”

শেফালী বেগমের এই সাফল্য কেবল একটি সনদ অর্জন নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় ও প্রতিকূলতা জয়ের গল্প। গোমনাতি টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ দিলীপ রায় বলেন, “দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে এমন সংগ্রামী শিক্ষার্থী খুব কমই দেখেছি। শেফালী প্রমাণ করেছেন, শিক্ষা বয়সের কাছে নয়, ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মানে।”

নীলফামারী জেলা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমানও তার এই অর্জনকে অত্যন্ত প্রশংসনীয় উল্লেখ করে বলেন, শেফালীর সাফল্য সমাজ থেকে ঝরে পড়া নারীসহ সকল বয়সীর জন্য নতুন করে স্বপ্ন দেখার পথ প্রশস্ত করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *