সংবাদ সারাদিন ডেস্ক | আন্তর্জাতিক | ৫ নভেম্বর ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা তাঁর ওপর বিরক্ত হয়ে পড়লে ইসরাইলে গিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন ফক্স নিউজের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’-এ দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে মজার ছলে এমন মন্তব্য করেন তিনি।
একই সাক্ষাৎকারে ইসরাইলকে দেওয়া প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের বার্ষিক মার্কিন সহায়তা বন্ধের পরিকল্পনার কথাও জানান ট্রাম্প। তাঁর দাবি, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে।
ইসরাইলে নিজের জনপ্রিয়তা ৯৯ শতাংশ দাবি ট্রাম্পের
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, ইসরাইলে তাঁর জনপ্রিয়তার হার ৯৯ শতাংশ।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ যদি কখনো তাঁর ওপর বিরক্ত হয়ে যায়, তাহলে তিনি ইসরাইলে চলে গিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হবেন।
তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে মূলত রসিকতা হিসেবেই দেখছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।
ইসরাইলে নিজের জনপ্রিয়তা ৯৯ শতাংশ বলে দাবি করলেও এর পক্ষে নির্দিষ্ট কোনো জনমত জরিপের তথ্য দেননি তিনি।
চলতি বছরের জুনে প্রকাশিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের আন্তর্জাতিক জরিপেও ট্রাম্প সম্পর্কে ইসরাইলিদের ইতিবাচক মনোভাব পাওয়া গেলেও তাঁর দাবি করা ৯৯ শতাংশ জনপ্রিয়তার প্রমাণ মেলেনি।
ইসরাইলকে বার্ষিক ৪০০ কোটি ডলার সহায়তা বন্ধের ঘোষণা
সাক্ষাৎকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ইসরাইলকে দেওয়া মার্কিন সামরিক সহায়তা।
ট্রাম্প জানান, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে চলতি বছরের শেষ নাগাদ দেশটিকে দেওয়া বার্ষিক প্রায় ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলারের সহায়তা বন্ধ করার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে।
ট্রাম্পের দাবি, ইসরাইল বর্তমানে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী। তাই আগের মতো মার্কিন অর্থসহায়তার প্রয়োজন নেই।
তিনি আরও বলেন, ডেমোক্র্যাট ও বামপন্থি রাজনীতিকেরা ইসরাইলকে দেওয়া বিপুল মার্কিন অর্থসহায়তার বিষয়টি রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সমালোচনায় ব্যবহার করছেন।
তবে এই ঘোষণা বাস্তবায়নের বিষয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে বিদ্যমান ১০ বছর মেয়াদি সামরিক সহায়তা চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৮ সাল পর্যন্ত বছরে প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
ফলে নির্ধারিত সময়ের আগে সহায়তা বন্ধ করতে হলে বিদ্যমান চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের ভূমিকা এবং অন্যান্য আইনি ও প্রশাসনিক বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।
এ বিষয়ে নেতানিয়াহুর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক সমর্থনমূলক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি।
৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছে।
নির্বাচনের এই ফল ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিশেষ করে অভিবাসননীতি, স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি ব্যয়, পররাষ্ট্রনীতি এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্তগুলো কংগ্রেসে আরও কঠোর নজরদারির মুখে পড়তে পারে।
নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানির দাম
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের পর ইরান যুদ্ধের প্রভাবের কথাও স্বীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্পের মতে, ইরান সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে।
তবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্তের পক্ষেই নিজের অবস্থান বজায় রেখেছেন তিনি।
অন্যদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও রিপাবলিকানদের নির্বাচনী পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেছেন।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান এখনো আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে রয়েছে।
ইরানে নতুন হামলার সম্ভাবনা নিয়ে যা বললেন ট্রাম্প
মঙ্গলবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরানের একটি বিমানবিধ্বংসী স্থাপনায় সীমিত মার্কিন হামলার কথাও জানান।
তাঁর দাবি, ওই স্থাপনাটি নির্মাণ শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সেখানে হামলা চালিয়েছে।
তবে একই দিনে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ইরানে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন বড় হামলা চালানোর পরিকল্পনা নেই।
তিনি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়ার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
কূটনৈতিক সমঝোতার পাশাপাশি সামরিক চাপ বজায় রাখার এই নীতি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
মার্কিন রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের পর ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আগামী দুই বছর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় প্রশাসনের আইন প্রণয়ন ও বাজেটসংক্রান্ত উদ্যোগে নতুন বাধা তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে ইসরাইলকে সহায়তা বন্ধের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত, ইরান যুদ্ধ এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিতর্ক বাড়াতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে ইসরাইলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের রসিকতাপূর্ণ মন্তব্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), ফক্স নিউজ, পিউ রিসার্চ সেন্টার ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।


