এনআইডি সংশোধনে জালিয়াতির অভিযোগ, বাতিল ১৩ লাখের বেশি আবেদন; কঠোর অবস্থানে ইসি

Table of content

Table of content

সংবাদ সারাদিন ডেস্ক | ঢাকা | ৫ নভেম্বর ২০২৬

জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য সংশোধনের সুযোগকে কেন্দ্র করে সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়া, ভুয়া উত্তরাধিকার দাবি এবং পাসপোর্টের তথ্য পরিবর্তনের মতো জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়ায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা, চাকরিচ্যুতি, ফৌজদারি মামলা ও গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

অন্যদিকে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাব, তথ্যের অসংগতি এবং একই বিষয়ে একাধিক আবেদন করার কারণে এখন পর্যন্ত ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৭টি এনআইডি সংশোধনের আবেদন বাতিল হয়েছে।

বুধবার (৪ নভেম্বর) বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া বক্তব্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন জানান, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের জালিয়াতি বরদাশত করা হবে না।

তিনি বলেন, অনিয়মের অভিযোগে অনেক কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। কয়েকজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তারের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

এনআইডি সংশোধনের আড়ালে সম্পত্তি জালিয়াতির অভিযোগ

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, কিছু ব্যক্তি এনআইডিতে নাম ও পরিচয় পরিবর্তন করে সম্পত্তি বিক্রি কিংবা অন্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন।

এ ছাড়া পাসপোর্টের তথ্যের সঙ্গে মিল দেখাতে জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ, নাম ও পিতা-মাতার পরিচয় পরিবর্তনের আবেদনও পাওয়া যাচ্ছে।

সিইসি জানান, অনেক সময় আবেদনকারীর দেওয়া তথ্যের সঙ্গে পূর্ববর্তী সরকারি নথির বড় ধরনের অসংগতি পাওয়া যায়। এ কারণে যথাযথ যাচাই ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংশোধনের অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, জালিয়াতি প্রতিরোধে আবেদনকারীর পরিচয়, পারিবারিক তথ্য, জন্মনিবন্ধন এবং শিক্ষাগত সনদসহ সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা হচ্ছে।

অনিয়মে দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত

এনআইডি-সংক্রান্ত জালিয়াতির অভিযোগের ভিত্তিতে সম্প্রতি দুই কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

ইসি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আ. ছত্তারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।

একইভাবে পঞ্চগড় সদর উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের অফিস সহকারী কামনা রানী সরকারকেও সাময়িক বরখাস্ত করেছে কমিশন।

সিইসি জানিয়েছেন, অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বাবা-ছেলের বয়সের ব্যবধান মাত্র তিন বছর!

এনআইডি সংশোধনের আবেদন যাচাই করতে গিয়ে অস্বাভাবিক তথ্যের মুখোমুখি হচ্ছেন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা।

কোনো কোনো আবেদনে বাবা ও ছেলের বয়সের ব্যবধান মাত্র তিন বছর। আবার মা ও মেয়ের বয়সের ব্যবধান পাওয়া যাচ্ছে দুই থেকে তিন বছর।

এমন অসংগতি ছাড়াও একই ব্যক্তির নামে একাধিক জন্মনিবন্ধন কিংবা পরস্পরবিরোধী শিক্ষাগত সনদের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ একটি উদাহরণ দিয়ে জানান, কোনো ব্যক্তি ১৯৯৭ সালে জন্মগ্রহণ করে ২০১৫ সালে ভোটার হয়েছেন। পরে তিনি জন্মসাল ২০০২ করতে চাইলে দেখা যায়, ভোটার নিবন্ধনের সময় তাঁর বয়স দাঁড়ায় মাত্র ১৩ বছর।

এ ধরনের সাংঘর্ষিক তথ্য সংশোধনের আবেদন গ্রহণে আইনগত ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়।

৬৪ লাখের বেশি আবেদন নিষ্পত্তি

ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এনআইডি সংশোধনের জন্য মোট ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ৮৪২টি আবেদন জমা পড়েছে।

এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২টি আবেদন।

বিভিন্ন কারণে বাতিল হয়েছে ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৭টি সংশোধন আবেদন।

অন্যদিকে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ১০টি আবেদন।

তবে আবেদন বাতিলের এই পরিসংখ্যানকে জালিয়াতির ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অনেক আবেদন প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি বা তথ্যের অসংগতির কারণেও বাতিল হয়েছে।

এ ছাড়া একজন ব্যক্তি একই বিষয়ে একাধিকবার আবেদন করতে পারেন। ফলে বাতিল হওয়া আবেদনের সংখ্যা এবং স্বতন্ত্র আবেদনকারীর সংখ্যা এক নয়।

বারবার আবেদন করেও ভোগান্তিতে নাগরিকরা

জালিয়াতি প্রতিরোধের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের এনআইডি সংশোধনে দীর্ঘসূত্রতা ও ভোগান্তির অভিযোগও রয়েছে।

যশোরের কেশবপুরের এক আবেদনকারী জানিয়েছেন, প্রায় ছয় মাস আগে স্ত্রীর নাম সংশোধনের আবেদন করেছিলেন তিনি।

প্রথমে তাঁকে জানানো হয়, স্ত্রীর নামে দুটি জন্মনিবন্ধন রয়েছে। একটি বাতিল করতে হবে।

সেই নির্দেশনা অনুসরণ করে একটি জন্মনিবন্ধন বাতিল করার পরও নতুন করে পরিবারের সদস্যদের প্রত্যয়নপত্র, বায়োমেট্রিক তথ্য এবং অতিরিক্ত নথিপত্র চাওয়া হয়।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে না পারায় দীর্ঘ সময় পরও সংশোধন সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

এ ধরনের পরিস্থিতি এনআইডি সংশোধনের প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।

কোন ধরনের সংশোধনে বেশি যাচাই-বাছাই?

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ সাধারণ সংশোধনের আবেদন উপজেলা পর্যায়েই নিষ্পত্তি করা সম্ভব।

তবে নাম, পিতা-মাতার পরিচয়, জন্মতারিখ কিংবা একাধিক মৌলিক তথ্য পরিবর্তনের আবেদন উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হতে পারে।

এসব ক্ষেত্রে আবেদনকারীর জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ, পিতা-মাতার এনআইডি এবং প্রয়োজনে ভাই-বোনদের পরিচয়সংক্রান্ত নথি যাচাই করা হয়।

শুধু হলফনামার ভিত্তিতে মৌলিক পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য পরিবর্তনের সুযোগ নেই বলেও জানিয়েছে ইসি।

অন্যদিকে ঠিকানা পরিবর্তন, বিবাহ বা বিবাহবিচ্ছেদের কারণে বৈবাহিক অবস্থার পরিবর্তনসহ কিছু সংশোধন নির্ধারিত পদ্ধতিতে তুলনামূলক সহজে সম্পন্ন করা সম্ভব।

আবেদন বাতিল হলে কী করবেন?

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, কোনো সংশোধনের আবেদন বাতিল হলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য সব সুযোগ শেষ হয়ে যায় না।

প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ ও কাগজপত্র সংগ্রহ করে পুনরায় আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আপিলের ব্যবস্থাও রয়েছে।

ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, কোনো কোনো আবেদন ছয় থেকে সাতবার পর্যন্ত বাতিল হওয়ার নজির রয়েছে।

তাঁর মতে, আবেদনকারীকে সঠিক নথি জমা দিতে হবে এবং তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রবাসীদের এনআইডি সেবায় বিশেষ গুরুত্ব

দেশের বাইরে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের এনআইডি সংশোধন ও ভোটার নিবন্ধন সেবা সহজ করার উদ্যোগও নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র-সংক্রান্ত সেবা চালু করা হয়েছে।

তবে প্রবাসীদের এনআইডি ও পাসপোর্টের তথ্যের মধ্যে অসংগতি থাকলে সংশোধনে অতিরিক্ত যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে।

বিশেষ করে জন্মতারিখ, নাম ও পিতা-মাতার পরিচয়ের তথ্যের অমিল থাকলে সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করতে হয়।

সিইসি জানিয়েছেন, সঠিক তথ্য ও নির্ভরযোগ্য কাগজপত্র থাকলে প্রবাসীদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে।

দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদানের কথা উল্লেখ করে তাঁদের সেবাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

নিরাপত্তা ও নাগরিক সেবার মধ্যে ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ

জাতীয় পরিচয়পত্র বর্তমানে ব্যাংকিং, পাসপোর্ট, জমি নিবন্ধন, মোবাইল সংযোগ এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবার গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ফলে এনআইডির তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে পরিবর্তন করা হলে সম্পত্তির মালিকানা, আর্থিক লেনদেন এবং নাগরিক পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে যথার্থ আবেদন নিষ্পত্তিতে অযথা বিলম্ব হলে সাধারণ নাগরিকদেরও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।

এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশনের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো—জালিয়াতি প্রতিরোধে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের পাশাপাশি বৈধ আবেদনকারীদের দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করা।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *