জীবনযাত্রার ব্যয়, অভিবাসননীতি ও প্রার্থীদের বিতর্ক ঘিরে ভোটারদের মনোভাব বদলাচ্ছে; নভেম্বরের নির্বাচনে নজর যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যটিতে
নিজস্ব প্রতিবেদক | আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সংবাদ সারাদিন
ঢাকা, ১৯ অক্টোবর ২০২৬: যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাসে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কঠোর অভিবাসননীতি নিয়ে অসন্তোষ এবং প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিতর্ককে কেন্দ্র করে ডেমোক্র্যাটরা অঙ্গরাজ্যটিতে নির্বাচনী সাফল্যের সম্ভাবনা দেখছেন। সাম্প্রতিক জনমত জরিপেও সিনেট ও গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে। [সূত্র: BSS/AFP, CBS News, The Texas Tribune]
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এবারের নির্বাচনে টেক্সাসের একটি মার্কিন সিনেট আসন এবং গভর্নর পদকে ঘিরে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ১৯৯৪ সালের পর অঙ্গরাজ্যজুড়ে কোনো নির্বাচনে জয়ী হয়ে ডেমোক্র্যাটদের কোনো প্রার্থী নির্বাচিত হতে পারেননি। ফলে এবার দলটির সম্ভাব্য অগ্রগতি মার্কিন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।
সিনেটের লড়াইয়ে এগিয়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী
সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রধান ভরসা ৩৭ বছর বয়সী সাবেক শিক্ষক ও অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতা জেমস তালারিকো। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটন, যিনি টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অক্টোবরের মাঝামাঝি ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসের জনমত জরিপে তালারিকো ৫০ শতাংশ এবং প্যাক্সটন ৪৭ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। অন্যদিকে, ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত CBS News-এর জরিপে তালারিকো ৫১ শতাংশ এবং প্যাক্সটন ৪৯ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। জরিপ দুটির ফলাফলই প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্রতা তুলে ধরছে। তবে এগুলো নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল নয়; নমুনা ও ত্রুটিসীমার কারণে প্রকৃত ভোটের ফল ভিন্ন হতে পারে।
তালারিকো অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা, সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা এবং রাজনৈতিক বিভাজন কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। শহর ও শহরতলির ভোটারদের পাশাপাশি হিস্পানিক জনগোষ্ঠী এবং স্বতন্ত্র ভোটারদের সমর্থন তাঁর প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের সমর্থনেও চাপে রিপাবলিকান শিবির
রিপাবলিকান প্রার্থী প্যাক্সটনের পক্ষে প্রচারে নেমেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। টেক্সাসে সিনেটের আসন হারালে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ঝুঁকিতে পড়তে পারে—এমন উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন তিনি।
তবে প্যাক্সটনের অতীত রাজনৈতিক বিতর্ক নির্বাচনী প্রচারে চাপ তৈরি করেছে। ২০২৩ সালে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে টেক্সাসের প্রতিনিধি পরিষদে তিনি অভিশংসিত হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে অঙ্গরাজ্যের সিনেটে বিচারের পর তিনি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান। এসব ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রচারের অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও প্যাক্সটনের প্রতি রক্ষণশীল ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন রয়েছে। ফলে জরিপে ডেমোক্র্যাটদের সামান্য এগিয়ে থাকার অর্থ এই নয় যে রিপাবলিকানদের পরাজয় নিশ্চিত।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও অভিবাসননীতি নির্বাচনের বড় ইস্যু
টেক্সাসের ভোটারদের মনোভাব পরিবর্তনের পেছনে অর্থনৈতিক চাপ ও অভিবাসননীতির প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান ও ব্যবসার ওপর কঠোর অভিবাসন অভিযানের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন কিছু ভোটার।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প টেক্সাসে প্রায় ১৪ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে হিস্পানিক ভোটারদের একটি অংশের সমর্থনও রিপাবলিকানদের সাফল্যে ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই ভোটারদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ব্যবসায়ী বেনি মেলেন্দেজের অভিজ্ঞতা এই পরিবর্তনের একটি উদাহরণ। ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া এই ব্যবসায়ীর দাবি, কঠোর অভিবাসন অভিযানের প্রভাবে তাঁর ব্যবসার কার্যক্রম, মুনাফা ও কর্মীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে এটি একজন ভোটারের অভিজ্ঞতা; পুরো অঙ্গরাজ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একক প্রমাণ হিসেবে একে দেখা যায় না।
কৃষি ও পশুপালন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোও শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক এবং উৎপাদনব্যবস্থায় বিঘ্নের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। অভিবাসননীতি তাই শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং শ্রমবাজার, ব্যবসা ও দ্রব্যমূল্যের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে।
গভর্নর পদেও কঠিন লড়াই
সিনেট নির্বাচনের পাশাপাশি গভর্নর পদেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে। তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটের প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসা।
হিনোজোসা জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা এবং জনসেবাকে প্রচারের কেন্দ্রে রেখেছেন। শিক্ষা খাতে অর্থায়ন ও পরিবারের অর্থনৈতিক চাপ কমানোর প্রতিশ্রুতিও তাঁর প্রচারের অংশ।
১৮ অক্টোবর প্রকাশিত CBS News-এর জরিপে অ্যাবট ৫২ শতাংশ এবং হিনোজোসা ৪৮ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। অর্থাৎ সিনেটের তুলনায় গভর্নর পদে রিপাবলিকান প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও জরিপের ফল প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের ইঙ্গিত দেয়।
জাতীয় রাজনীতিতে কেন গুরুত্বপূর্ণ টেক্সাস?
টেক্সাসের নির্বাচনী ফল শুধু অঙ্গরাজ্যটির নেতৃত্ব নির্ধারণ করবে না; যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। সিনেটের আসনটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে গেলে জাতীয় পর্যায়ে আইন প্রণয়ন, সরকারি নীতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
তবে টেক্সাসে রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক শক্তি, রক্ষণশীল ভোটারদের সমর্থন এবং নির্বাচনী প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা এখনও গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক অসন্তোষ ও ভোটারদের অংশগ্রহণ ডেমোক্র্যাটদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে, টেক্সাসে এবারের নির্বাচন রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের আধিপত্যের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতি তাদের সম্ভাবনা বাড়ালেও শেষ পর্যন্ত ফল নির্ভর করবে ভোটার উপস্থিতি, শেষ মুহূর্তের প্রচার এবং নির্বাচনী দিনের সিদ্ধান্তের ওপর।


