আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সংবাদ সারাদিন | ১৯ অক্টোবর ২০২৬
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা এক নারীর সঙ্গে নতুন জীবন শুরুর স্বপ্ন দেখেছিলেন ব্রাজিলের ৪৯ বছর বয়সী রাজমিস্ত্রি এডিমার মার্তিনস। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে নিজের জিনিসপত্র বিক্রি করে প্রায় ১ হাজার ৯০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছান দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর বেলো হরিজন্তে। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, যাঁর সঙ্গে দেখা করার আশায় এত দূর এসেছেন, সেই নারী বাস্তবে কোনো মানুষ নন—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি একটি কাল্পনিক চরিত্র।
শেষ পর্যন্ত অর্থ ফুরিয়ে অপরিচিত শহরে আটকে পড়া মার্তিনসকে সহায়তার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হতে হয়। ঘটনাটি অনলাইনে এআই-নির্মিত পরিচয় ব্যবহার করে মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসকে প্রভাবিত করার ঝুঁকি সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি ও নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে চ্যানেল ২৪।
২০২০ সালে নজরে আসে নারীর অ্যাকাউন্ট
ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মারানিয়াও প্রদেশের বাসিন্দা মার্তিনস পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি। স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম টিভি মিরান্তেকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘জেসিকা অলিভেইরা’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট তাঁর নজরে আসে। ওই নারী ‘জেসিকা ফাজেন্দেইরা’ নামেও পরিচিত ছিলেন।
অ্যাকাউন্টটিতে খামারকেন্দ্রিক গ্রামীণ জীবনের বিভিন্ন ভিডিও প্রকাশ করা হতো। সেখানে একজন নারীকে শান্ত পরিবেশে বসবাস করতে দেখা যেত। ভিডিও ও পোস্টে পুরুষদের তাঁর সঙ্গে থাকতে আসার আহ্বান জানানো এবং থাকার জায়গা ও আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার বিষয়ও উঠে আসে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যাকাউন্টটির অনুসারী ছিল তিন লাখের বেশি। বিপুল অনুসারী ও নিয়মিত ভিডিও প্রকাশের কারণে অ্যাকাউন্টটি অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে। মার্তিনসও ওই নারীর সঙ্গে দেখা করে নতুন জীবন শুরু করার
সম্ভাবনা দেখেছিলেন।
একাকিত্ব থেকে নতুন জীবন শুরুর আশা
মার্তিনসের মা মারা যাওয়ার পর তিনি একাকিত্বের মধ্যে ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা ওই নারীকে তিনি সম্ভাব্য জীবনসঙ্গী হিসেবে ভাবতে শুরু করেন।
অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে ওই চরিত্রটি আর্থিক সহায়তা এবং নিজের খামারে থাকার জায়গা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বলে জানা গেছে। এসব বিষয় মার্তিনসের প্রত্যাশাকে আরও জোরালো করে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: প্রকাশিত প্রতিবেদনে অ্যাকাউন্টে ওই প্রতিশ্রুতিগুলোর কথা থাকলেও, অ্যাকাউন্ট পরিচালনাকারী ব্যক্তি পরে মার্তিনসের সঙ্গে সরাসরি ব্যক্তিগত যোগাযোগের কথা অস্বীকার করেন। ফলে দুজনের মধ্যে বাস্তব ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা সরাসরি কথোপকথন হয়েছিল—এমন দাবি নিশ্চিতভাবে করা যাচ্ছে না।
জিনিসপত্র বিক্রি করে দীর্ঘ যাত্রা
ওই নারীকে বাস্তবে খুঁজে পাওয়ার আশায় মার্তিনস নিজের জিনিসপত্র বিক্রি করে যাত্রার খরচ জোগাড় করেন। নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৯ অক্টোবর তিনি বেলো হরিজন্তের উদ্দেশে রওনা দেন এবং ১১ অক্টোবর সেখানে পৌঁছান।
প্রায় ১ হাজার ৯০০ কিলোমিটারের বেশি পথ বাসে পাড়ি দিতে তাঁর এক দিনেরও বেশি সময় লাগে। গন্তব্যে পৌঁছে তিনি ওই নারীর ছবি সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেন। পথচারীদের ছবিটি দেখিয়ে জানতে চান, তাঁরা ওই নারীকে চেনেন কি না। কিন্তু কেউ তাঁকে শনাক্ত করতে পারেননি।
এরপর তিনি স্থানীয় একটি রেডিও স্টেশনের সহায়তা নেন। সেখানেই জানতে পারেন, যে নারীর সঙ্গে দেখা করার আশায় তিনি এত দূর এসেছেন, তাঁর বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে দেখা নারীটি এআই দিয়ে তৈরি একটি চরিত্র।
অ্যাকাউন্ট পরিচালনাকারীর স্বীকারোক্তি
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর অ্যাকাউন্টটির পেছনে থাকা ব্যক্তি চরিত্রটি এআই দিয়ে তৈরি বলে স্বীকার করেন। তবে মার্তিনসের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কিংবা তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে বেলো হরিজন্তে আসার আমন্ত্রণ জানানোর কথা অস্বীকার করেন তিনি।
অ্যাকাউন্ট পরিচালনাকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, চরিত্রটি তৈরির উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পৃক্ততা বাড়ানো এবং পরবর্তী সময়ে অ্যাকাউন্টটি বিক্রির সুযোগ তৈরি করা। অর্থাৎ, অনলাইনে একজন বাস্তব নারীর মতো উপস্থাপিত চরিত্রটি মূলত দর্শক আকর্ষণের জন্য তৈরি করা হয়েছিল বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
এ ঘটনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় ছবি, ভিডিও, নিয়মিত পোস্ট কিংবা বিপুল অনুসারী থাকলেই কোনো অ্যাকাউন্টের পরিচয় সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় না।
অর্থহীন অবস্থায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সহায়তা
যাত্রার জন্য নিজের সম্পদ বিক্রি করে ফেলায় বেলো হরিজন্তে পৌঁছানোর পর মার্তিনসের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না। প্রত্যাশিত ব্যক্তিকে খুঁজে না পেয়ে এবং ফিরে যাওয়ার খরচ জোগাড় করতে না পেরে তিনি স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষের সহায়তা চান।
পরে সমাজকর্মীরা তাঁকে খাবার, গোসলের সুযোগ এবং নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার জন্য বাসের টিকিটসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অভিজ্ঞতার পরও জীবনসঙ্গী খোঁজার আশা ছাড়েননি মার্তিনস। তিনি ভবিষ্যতে আবার বেলো হরিজন্তে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তবে এবার বাস্তব কোনো মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আশায়।
এআই-নির্মিত পরিচয় নিয়ে নতুন প্রশ্ন
এআই প্রযুক্তির সাহায্যে এখন বাস্তব মানুষের মতো দেখতে ছবি, ভিডিও ও কাল্পনিক ব্যক্তিত্ব তৈরি করা সম্ভব। এসব কনটেন্ট বিনোদন, বিপণন কিংবা ব্যবসায়িক প্রচারে ব্যবহার করা হলেও, চরিত্রটি কৃত্রিমভাবে তৈরি—এ তথ্য গোপন থাকলে দর্শকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
মার্তিনসের ঘটনা অনলাইন পরিচয় যাচাইয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে। বিশেষ করে অপরিচিত কারও সঙ্গে সম্পর্কের প্রত্যাশায় অর্থ ব্যয়, সম্পদ বিক্রি কিংবা দীর্ঘ ভ্রমণের মতো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।
কোনো অ্যাকাউন্টে এআই-নির্মিত ছবি বা ভিডিও রয়েছে কি না, পরিচয়টি অন্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে যাচাই করা যায় কি না এবং আর্থিক সহায়তা বা ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতির দাবির পেছনে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ আছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করা দরকার।
মার্তিনসের অভিজ্ঞতা তাই শুধু অপূর্ণ প্রেমের গল্প নয়; এটি ডিজিটাল দুনিয়ায় প্রযুক্তিনির্ভর ভুয়া পরিচয় মানুষের আবেগ, অর্থ ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তারও একটি সতর্কবার্তা।


