কাতার, সৌদি আরব ও আমিরাতে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে বড় ধাক্কা; পর্যটক কমায় হোটেল, আবাসন ও বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সংবাদ সারাদিন
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। জ্বালানি রপ্তানি ও পরিবহনপথে বিঘ্ন, বিমান চলাচলে অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিতে পর্যটন, আবাসন ও বিদেশি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রকাশিত রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চলতি বছরের অর্থনৈতিক ধাক্কা কাটিয়ে ২০২৭ সালে দ্রুত পুনরুদ্ধারের যে প্রত্যাশা ছিল, নতুন করে সংঘাত বাড়ায় তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে অর্থায়নের আগে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও সতর্কভাবে বিবেচনা করতে পারেন।
প্রবৃদ্ধিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে কাতারের অর্থনীতি ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। একই সময়ে সৌদি আরবের অর্থনীতি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পূর্বাভাসের পেছনে জ্বালানি রপ্তানিতে বিঘ্ন, হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তা এবং পর্যটন ও অন্যান্য সেবা খাতের দুর্বলতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে ২০২৭ সালে পরিস্থিতির উন্নতি হলে এসব অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাও রয়েছে। সেই সম্ভাবনা অনেকটাই নির্ভর করছে সংঘাতের স্থায়িত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ স্বাভাবিক হওয়ার ওপর।
পর্যটন ও হোটেল ব্যবসায় চাপ
উপসাগরীয় দেশগুলো গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক পর্যটন, বিলাসবহুল হোটেল, বিমান পরিবহন ও বিনোদন খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু সংঘাতের কারণে ভ্রমণকারীদের আস্থা কমে যাওয়া এবং বিমান চলাচলে অনিশ্চয়তা এসব খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে দুবাইয়ে রাতযাপনকারী পর্যটকের সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৪ শতাংশ কমেছে। সেপ্টেম্বর মাসে দুবাই থেকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য নির্ধারিত ফ্লাইটের আসনসংখ্যাও আগের বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ কম ছিল।
এদিকে দুবাইয়ের হোটেলগুলোর কক্ষ-ব্যবহারের হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ নিচে রয়েছে। পর্যটক কমে যাওয়া এবং ব্যবসায়িক ভ্রমণ সীমিত হওয়ায় হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও বিনোদনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও চাপের মুখে পড়তে পারে।
আবাসন ও বিদেশি বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা
উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হলো তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পর্যটন, প্রযুক্তি, অর্থনীতি, পরিবহন ও আবাসন খাতকে শক্তিশালী করা। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন প্রকল্পে অর্থায়ন পিছিয়ে দিতে পারেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুবাইয়ের আবাসিক সম্পত্তির লেনদেনের পরিমাণ ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৩ শতাংশ কমেছে।
এ পরিস্থিতি সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০-এর মতো অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এসব পরিকল্পনায় বিদেশি পুঁজি, আন্তর্জাতিক ব্যবসা এবং পর্যটকের ধারাবাহিক আগমন প্রত্যাশিত। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এসব লক্ষ্য অর্জনের সময়সীমা ও ব্যয়কে প্রভাবিত করতে পারে।
জ্বালানি ও বাণিজ্যপথের ঝুঁকি
হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এ অঞ্চলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেল ও গ্যাস পরিবহন, জাহাজ চলাচল, বীমা ব্যয় এবং সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। এর প্রভাব শুধু উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; আন্তর্জাতিক বাজারেও জ্বালানির দাম ও পরিবহন ব্যয় অস্থির হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব দেশের অর্থনীতি জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের ক্ষেত্রে উৎপাদন ও রপ্তানি স্বাভাবিক রাখতে না পারলে উচ্চ জ্বালানিমূল্য থেকেও প্রত্যাশিত সুবিধা পাওয়া কঠিন হতে পারে। অন্যদিকে পর্যটন ও অন্যান্য সেবানির্ভর অর্থনীতিগুলো ভ্রমণকারীর আস্থা কমে যাওয়ার কারণে অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়তে পারে।
২০২৭ সালের পুনরুদ্ধার কতটা সম্ভব?
আইএমএফের পূর্বাভাসে ২০২৭ সালে উপসাগরীয় কয়েকটি অর্থনীতিতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই প্রত্যাশা গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ স্বাভাবিক হওয়া এবং জ্বালানি উৎপাদন ও পরিবহন পুনরুদ্ধারের ওপর নির্ভরশীল।
সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পর্যটক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে বেশি সময় লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে অবকাঠামো উন্নয়ন, হোটেল ও আবাসন প্রকল্প এবং অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের পরিকল্পনায় বিলম্ব হতে পারে।
সব মিলিয়ে, উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এখন শুধু জ্বালানির বাজার নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


