গুম প্রতিরোধে নতুন আইনি কাঠামো: তদন্ত ও বিচার শেষ করতে ১২০ দিন করে সময়

সংবাদ সারাদিন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৪ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৪ আগস্ট ২০২৬

জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ, গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের অধিকার নিশ্চিত করতে নতুন একটি কঠোর আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ১৫তম বৈঠকে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে খসড়া আইনটি অনুমোদিত হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আইনটি প্রণয়ন করা হচ্ছে। তবে মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেলেও এটি এখনো কার্যকর আইন নয়। আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের যাচাই-বাছাই এবং পরবর্তী সাংবিধানিক ও সংসদীয় প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর আইনটি কার্যকর হতে পারবে।

প্রস্তাবিত আইনটি কার্যকর হলে গুমকে বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে একটি পৃথক বা স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। খসড়ায় অপরাধটিকে আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য এবং আপস-অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আদালতের নির্দিষ্ট অনুমতি ছাড়াই তদন্তের প্রাথমিক পদক্ষেপ নিতে পারবে, সাধারণভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তি সহজে জামিন দাবি করতে পারবেন না এবং ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তের মধ্যে আপসের মাধ্যমে মামলাটি নিষ্পত্তির সুযোগ থাকবে না।

খসড়া অনুযায়ী, গুমের সাধারণ অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুমের শিকার ব্যক্তির মৃত্যু হলে, তাঁর মরদেহ পাওয়া গেলে অথবা পাঁচ বছর অতিক্রম করার পরও তাঁকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া সম্ভব না হলে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। গুরুতর গুমের ঘটনায় অর্থদণ্ড আরোপের বিধানও খসড়ায় রাখা হয়েছে।

তবে জরিমানার সর্বোচ্চ অঙ্ক নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার বাংলা প্রতিবেদনে এক কোটি টাকা বলা হলেও প্রথম আলোর ইংরেজি প্রতিবেদনে ১০ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে আইন মন্ত্রণালয়ের যাচাই শেষে খসড়ার আনুষ্ঠানিক পাঠ প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত জরিমানার সুনির্দিষ্ট অঙ্ক নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাচ্ছে না।

আইনটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গুম হওয়া ব্যক্তিকে দ্রুত খুঁজে বের করার জন্য আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা জারির ব্যবস্থা। কোনো ব্যক্তি গোপন বা বেআইনি স্থানে আটক রয়েছেন—এমন তথ্য পাওয়া গেলে আদালত সংশ্লিষ্ট স্থানে তল্লাশির নির্দেশ দিতে পারবেন। এর মাধ্যমে গোপন বন্দিশালা অথবা অঘোষিত আটককেন্দ্রে কোনো ব্যক্তিকে রাখা হয়েছে কি না, তা অনুসন্ধানের জন্য একটি সরাসরি আইনি পথ তৈরি হবে।

প্রস্তাবিত আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তি পলাতক থাকলে বা আদালতে উপস্থিত না হলে তাঁর অনুপস্থিতিতেও বিচার পরিচালনার বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি মোবাইল ফোনের তথ্য, ভিডিও, অডিও, ডিজিটাল বার্তা, অনলাইন যোগাযোগ, অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ আদালতে গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। গুমের মতো অপরাধে প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য বা প্রচলিত কাগুজে প্রমাণ পাওয়া কঠিন হতে পারে—এই বাস্তবতা বিবেচনায় ডিজিটাল সাক্ষ্যকে গুরুত্বপূর্ণ করা হয়েছে।

অভিযোগকারী, সাক্ষী, তথ্য প্রকাশকারী এবং ভুক্তভোগীর পরিচয়, গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা রক্ষার ব্যবস্থাও প্রস্তাবিত আইনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গুমের অভিযোগ করার কারণে কোনো ব্যক্তি বা পরিবার যেন হুমকি, হয়রানি, প্রতিশোধ অথবা নতুন করে নির্যাতনের শিকার না হন, সে জন্য তাঁদের সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।

ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারকে শুধু বিচার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নয়, অধিকারসম্পন্ন পক্ষ হিসেবেও স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তদন্ত কত দূর এগিয়েছে, ঘটনার প্রকৃত সত্য কী এবং গুম হওয়া ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি সম্পর্কে জানার অধিকার তাঁদের থাকবে। সরকারি খরচে আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

খসড়া অনুযায়ী, আদালতে দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ভুক্তভোগী বা তাঁর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে। দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব না হলে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠনের প্রস্তাব রয়েছে।

গুম হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী, সন্তান অথবা নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের আর্থিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার বিষয়টিও খসড়ায় গুরুত্ব পেয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে পরিবারের ভরণপোষণ এবং জরুরি প্রয়োজন মেটাতে তাঁর সম্পত্তি ব্যবহারের জন্য আদালতের অনুমতি নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

কোনো ব্যক্তি পাঁচ বছর ধরে গুম থাকলে এবং তাঁর জীবিত বা মৃত অবস্থার কোনো সন্ধান পাওয়া না গেলে আদালত বা নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ‘গুম সনদ’ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এই সনদের ভিত্তিতে তাঁর বৈধ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে। দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার কারণে পরিবারগুলো সম্পত্তি, ব্যাংক হিসাব, উত্তরাধিকার এবং ভরণপোষণের ক্ষেত্রে যে জটিলতায় পড়ে, এই বিধান সেই সমস্যা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

প্রস্তাবিত আইনে গুমসংক্রান্ত সব অভিযোগ, তদন্ত, উদ্ধার, ভুক্তভোগীর পরিচয় এবং মামলার অগ্রগতি সংরক্ষণের জন্য একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরির বিধান রাখা হয়েছে। বিদেশে কোনো অভিযুক্তের অবস্থান, সীমান্তের বাইরে তথ্য সংগ্রহ অথবা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার সহায়তা প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেওয়ার ব্যবস্থাও খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তদন্ত ও বিচার দীর্ঘায়িত হয়ে ভুক্তভোগীর পরিবার যেন নতুন করে অনিশ্চয়তায় না পড়ে, সে জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। খসড়ায় তদন্ত সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে। তদন্ত শেষে বিচারও সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে বাস্তবে এই সময়সীমা কীভাবে কার্যকর হবে এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে সময় বাড়ানোর সুযোগ থাকবে কি না, তা আইনের চূড়ান্ত পাঠ ও বিধিমালা প্রকাশের পর পরিষ্কার হবে।

বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট সব ব্যক্তিকে জোরপূর্বক গুম থেকে সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে যুক্ত হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে দেশের আইনি কাঠামোয় রূপ দেওয়া এবং গুমের অপরাধের জন্য পৃথক জবাবদিহির ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাও নতুন আইন প্রণয়নের অন্যতম প্রেক্ষাপট।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়েছিল। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বিল আকারে অনুমোদিত না হওয়া অধ্যাদেশগুলোর সঙ্গে এটিও কার্যকারিতা হারায়। পরে সরকার বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে আরও পরিমার্জিত ও কার্যকর একটি আইন সংসদে তোলার ঘোষণা দেয়।

সরকার ২০২৬ সালের জুন ও জুলাইয়ে আইনটির খসড়া নিয়ে কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী, মানবাধিকারকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, আইনটি মানবাধিকার, ব্যক্তি-স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করবে।

তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো আগের খসড়ার কয়েকটি দিক নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল। তাদের মধ্যে স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের নিরপেক্ষতা, ভুক্তভোগীদের দ্রুত ক্ষতিপূরণ এবং আটক ব্যক্তির অবস্থান গোপন রাখার সম্ভাব্য সুযোগ বন্ধ করার বিষয়গুলো ছিল অন্যতম। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত সর্বশেষ খসড়ায় এসব উদ্বেগ কতটা সমাধান করা হয়েছে, তা পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশের পর স্পষ্ট হবে।

আইনটি চূড়ান্তভাবে পাস হলে গুমের অভিযোগ তদন্ত, নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসন এবং অপরাধীদের বিচারের জন্য দেশে একটি স্বতন্ত্র আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হবে। তবে আইন অনুমোদনের পাশাপাশি নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষীদের নিরাপত্তা, বিচারিক সক্ষমতা এবং আইনটির রাজনৈতিক অপব্যবহার রোধ করাও কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *