কৃষকদের সার্বিক স্বার্থ সুরক্ষা ও অধিকার আদায়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সংগঠন গড়ে তোলার আহ্বান মহামান্য রাষ্ট্রপতির 

সংবাদ সারাদিন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর | আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬  

দেশের অন্নদাতা কৃষকদের সামগ্রিক কল্যাণ, ন্যায্য অধিকার আদায় এবং দলীয় কিংবা মতপার্থহ্যের ঊর্ধ্বে উঠে তাদের সামগ্রিক স্বার্থ সুসংহত করার লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র কেন্দ্রীয় কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর ঐতিহাসিক বঙ্গভবনে বাংলাদেশ কৃষক সমিতির সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান কুল ময়েজের নেতৃত্বে একটি আট সদস্যের প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও জনকল্যাণমুখী প্রস্তাব তুলে ধরেন। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম গণমাধ্যমকে এই সাক্ষাতের বিস্তারিত বিষয়বস্তু অবহিত করেছেন। সাক্ষাতকালে প্রতিনিধিদলের অন্যান্য বিশিষ্ট সদস্যদের মধ্যে মো. আব্দুল জলিল, মো. হাসান আলী, মোছা. বেলী বেগম, মো. আবু তালেব জোয়াদ্দার, মো. হাফিজুর রহমান মুকুল, তোফাজ্জল হোসাইন এবং শওকত আলম উপস্থিত ছিলেন।

কৃষকদের দেশের প্রকৃত ও শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে অভিহিত করে রাষ্ট্রপতি বলেন যে, এ দেশের সিংহভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত এবং তারাই মূলত সত্যিকারের দেশ গড়ার অকুতোভয় যোদ্ধা। কৃষকদের এই মহিমান্বিত অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত ও অনুপ্রাণিত করার জন্য কৃষি ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্ভাবন এবং অসামান্য সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ খুব শীঘ্রই ‘রাষ্ট্রপতি কৃষি পুরস্কার’ চালুর কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলে তিনি এসময় আশ্বস্ত করেন। কৃষকদের সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রিপরিষদ ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের অধিকার রক্ষা আন্দোলনকে আরও বেগবান করার তাগিদ দেন। আমাদের জাতীয় অর্থনীতির সবচেয়ে গতিশীল ও ইতিবাচক খাত হলো কৃষি উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, কৃষকদের হাড়ভাঙা পরিশ্রম, মেধা এবং উন্নত উচ্চফলনশীল জাত ও আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের ফলেই আজ দেশের খাদ্য উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষকরা কখনো দুর্নীতিতে জড়ায় না বরং সততা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক অগ্রগতিতে অনন্য অবদান রেখে চলেছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তবে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের সঠিক ও ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কৃষকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন যে, কৃষিজাত পণ্য এবং বিভিন্ন শস্য যাতে কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর হয়রানি ছাড়াই সরাসরি ভোক্তার দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারে এবং চাষিরা যাতে তাদের ঘাম ঝরানো ফসলের প্রকৃত দাম পান, সেজন্য একটি অত্যন্ত কার্যকর ও আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এ বিষয়ে কৃষকদের আরও বেশি সচেতন, উদ্যোগী ও সজাগ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি জানান যে, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবং কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে বর্তমান সরকার ইতিমধ্যে একটি নতুন বিশেষ স্কিম চালু করেছে, যার আওতায় ৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল তহবিল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বর্তমান সরকার কৃষকদের স্বস্তি দিতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সমস্ত সুদসহ কৃষিঋণ সম্পূর্ণ মওকুফ করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, সহজ শর্তে ও কম সুদে কৃষিঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করাসহ কৃষির সামগ্রিক উন্নয়নে সরকার নানামুখী কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং অচিরেই দেশের কৃষক সমাজ এর সুফল ভোগ করবে।

সাক্ষাৎকালে কৃষক সমিতির প্রতিনিধিদল কৃষকদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী দাবি রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করেন, যার মধ্যে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, সম্পূর্ণ বিনা সুদে ঋণ সুবিধা প্রদান, কৃষকদের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতীয়ভাবে ‘কৃষক দিবস’ উদযাপন ও বিশেষ পুরস্কার প্রবর্তন, শস্য বীমা চালু করা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে কৃষকদের প্রতিনিধিত্ব রাখা, বজ্রপাত ও সাপে কাটা থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা এবং আধুনিক কৃষি উপকরণের সুলভ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি প্রধানত অন্তর্ভুক্ত ছিল। দেশের উৎপাদিত ফলমূল ও কৃষিজাত প্রক্রিয়াজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা ও অফুরন্ত সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণার সাহায্য নিয়ে এসব পণ্য বিদেশে রপ্তানিতে এগিয়ে আসার জন্য সমিতির সদস্যদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান। পাশাপাশি, দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষিনির্ভর প্রক্রিয়াজাত শিল্প-কারখানা ও আধুনিক হিমাগার (কোল্ড স্টোরেজ) স্থাপনে উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি খামারগুলোতে আধুনিক সোলার প্যানেল ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। এনজিও বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণের চড়া সুদের হার কমানোর বিষয়েও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য তিনি আশ্বস্ত করেন। এদিকে কৃষক সমিতির সভাপতি ঈশ্বরদীতে কৃষিক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য সত্তরোর্ধ্ব প্রবীণ কৃষকদের বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা প্রদান এবং আধুনিক কৃষিপণ্যের প্রদর্শন ও বাণিজ্যিকীকরণের লক্ষ্যে একটি বিশেষ মেলা আয়োজনের উদ্যোগের কথা রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন এবং আগামীতে অনুষ্ঠিতব্য ওই মেলায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার বিনীত আমন্ত্রণ জানান। রাষ্ট্রপতি আনন্দের সঙ্গে সেই মেলায় উপস্থিত থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং এই গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাতকালে রাষ্ট্রপতির সচিবগণ উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *