আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সংবাদ সারাদিন
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে অনুষ্ঠিত এশিয়ার রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অব এশিয়ান পলিটিক্যাল পার্টিজের (আইসিএপিপি) ১৩তম সাধারণ অধিবেশনে ভাইস চেয়ারপারসন নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর এ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষমতাসীন মিনজু (ডেমোক্রেটিক) পার্টি ও বিরোধী দল পিপল পাওয়ার পার্টির যৌথ আয়োজনে সিউলের দ্য শিলা সিউল হোটেলে এ সম্মেলনের উদ্বোধন করা হয়। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘পরিবর্তনশীল বিশ্বে আস্থা পুনর্গঠন’।
উদ্বোধনের পর প্রথম প্ল্যানারি অধিবেশনে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের প্রধান ইসমাইল জবিউল্লাহ। এ সময় তিনি বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত ও আস্থার সংকট মোকাবিলায় গণতন্ত্র, সুশাসন, আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান।
সম্মেলনের প্রতিপাদ্যকে সময়োপযোগী উল্লেখ করে তিনি বলেন, বৈশ্বিক শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারস্পরিক আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা জরুরি। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জনগণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে একটি সামাজিক চুক্তি। জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, আইনের শাসন এবং মৌলিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা এ চুক্তির ভিত্তি হওয়া প্রয়োজন।
ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেটকে শুধু ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ নয়, বরং জনগণের সেবা করার দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে। সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার নীতিতে বাংলাদেশ বিশ্বাসী বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ফিলিস্তিনসহ মধ্যপ্রাচ্যের মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ভূরাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে মানবজীবনের মর্যাদাকে স্থান দিতে হবে। আন্তর্জাতিক নীতি ও আদর্শ সবার ক্ষেত্রে বৈষম্যহীনভাবে প্রয়োগের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
আন্তমহাদেশীয় রাজনৈতিক সংলাপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বিএনপির এই নেতা বলেন, বর্তমান বিশ্বে কোনো অঞ্চলই অন্য অঞ্চলের সংকট থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। ইউরোপের অস্থিরতার প্রভাব এশিয়ায় পড়তে পারে, একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাব ইউরোপেও পৌঁছায়। তাই বিভিন্ন মহাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নিয়মিত সংলাপ ও সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগে বিএনপি সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে আগ্রহী বলেও জানান তিনি।
অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, কোনো দেশের রাজনৈতিক দলকে সমর্থনের নামে সংশ্লিষ্ট দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করা উচিত নয়। আন্তসীমান্ত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রতিরোধে আইসিএপিপির একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন তিনি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সম্ভাবনা ও ঝুঁকি নিয়েও বক্তব্য দেন তিনি। তাঁর মতে, এআই উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করলেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে। আধুনিক যুদ্ধব্যবস্থায় এ প্রযুক্তির ব্যবহারও উদ্বেগের বিষয়। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আইসিএপিপির উদ্যোগে একটি অভিন্ন কৌশলগত নীতিপত্র প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।
এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জাতীয় বাজেটে উপযুক্ত বরাদ্দ এবং জলবায়ু অর্থায়নে ন্যায্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন ইসমাইল জবিউল্লাহ। তরুণদের মধ্যে ভুল তথ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্যের প্রভাব, বিষণ্নতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসংকট মোকাবিলায়ও আইসিএপিপিকে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, বিশ্বের ভবিষ্যৎ শুধু শক্তি বা সম্পদের ওপর নির্ভর করবে না; আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস ধরে রাখতে কতটা সক্ষম, তার ওপরও তা নির্ভরশীল। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি আস্থা পুনর্গঠনকে অভিন্ন ভবিষ্যতের স্থায়ী অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণের আহ্বান জানান।
সম্মেলনে বাংলাদেশের পাঁচ রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদল
আইসিএপিপির ১৩তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের পাঁচটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। বিএনপির প্রতিনিধিদলে ইসমাইল জবিউল্লাহর সঙ্গে রয়েছেন দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিদলে রয়েছেন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী ও সালাহউদ্দিন আইয়ুবী। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতিনিধিদলে রয়েছেন মুহাম্মদ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, মনিরা শারমিন ও মো. আলাউদ্দিন।
এ ছাড়া জাতীয় পার্টির প্রতিনিধিদলে রয়েছেন মো. মমতাজ উদ্দিন ও মো. আলাহান উদ্দিন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে রয়েছেন কে এম বিল্লাল ও মো. রাজন সিকদার।
এশিয়ার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংলাপ জোরদার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নে অভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের লক্ষ্য নিয়ে আয়োজিত এ সম্মেলন ৬ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে। সম্মেলন শেষে ৭ নভেম্বর অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিদের জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে।


