রংপুর | ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | জাতীয় ডেস্ক, সংবাদ সারাদিন
রংপুর অঞ্চলে আগাম জাতের আমন ধানের ভালো ফলনে কৃষকদের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, তুলনামূলক কম রোগবালাই এবং যথাযথ পরিচর্যায় এবার আশানুরূপ ফলন পেয়েছেন অনেক কৃষক। ধান কাটার পর একই জমিতে আলু, ভুট্টা ও শীতকালীন শাকসবজি চাষের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তাঁরা। তবে সার, শ্রমিক ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ভালো ফলন সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত লাভ নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না কৃষকদের।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) জানায়, সোমবার রংপুর সদর উপজেলার হরিদেবপুর এলাকায় সরেজমিনে আগাম আমন ধান কাটার ব্যস্ততা দেখা গেছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাকা ধান ঘরে তুলছেন কৃষকেরা। তাঁদের প্রত্যাশা, ধান বিক্রির অর্থ দিয়ে সংসারের ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি পরবর্তী মৌসুমের ফসল আবাদ করা সম্ভব হবে।
রংপুরে ১ লাখ ৬৬ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে আমন আবাদ
জেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রংপুর জেলায় ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত আগাম জাতের আমন ধান কাটা হয়েছে ৪৩৫ হেক্টর জমিতে। আগাম জাতের ধানের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৩ দশমিক ১৫ টন বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলা—রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে এ বছর ৬ লাখ ২১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। এসব জেলায় চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ লাখ ১ হাজার ৩৯১ টন। এর মধ্যে আগাম জাতের আমন ধান চাষ হয়েছে ৩৩ হাজার হেক্টর জমিতে।
ধান কাটার পর একই জমিতে নতুন ফসলের পরিকল্পনা
আগাম জাতের আমন চাষের একটি বড় সুবিধা হলো, তুলনামূলক কম সময়ে ধান ঘরে তোলা যায়। এরপর একই জমিতে শীতকালীন ফসল আবাদ করে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
রংপুর সদর উপজেলার হরিদেবপুর গ্রামের কৃষক রহমত আলী জানান, তাঁর জমিতে দোনপ্রতি প্রায় ১২ থেকে ১৫ মণ ধান হয়েছে। প্রতি মণ ধান ৬২০ টাকা দরে বিক্রি করছেন তিনি। ধান কাটার পর ওই জমিতে আলু এবং পরে ভুট্টা চাষের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
মহিপুর তিস্তার চর এলাকার কৃষক শফিয়ার রহমান জানান, পাঁচ বিঘা জমিতে আগাম আমন চাষ করে তিন বিঘা থেকে ৪৭ মণ ধান পেয়েছেন। বাকি জমির ধান পরে কাটবেন। তাঁর হিসাবে, আগাম আমনের ফলন সাধারণ আমনের তুলনায় বিঘাপ্রতি দুই থেকে তিন মণ কম হতে পারে। তবে আগাম ধান কাটার সুবিধা কাজে লাগিয়ে একই জমিতে ফুলকপি, গাজর, বেগুন ও ধনিয়াপাতাসহ শীতকালীন ফসল চাষ করা যায়।
উৎপাদন খরচ বেড়েছে, লাভ নিয়ে উদ্বেগ
ভালো ফলনের খবর থাকলেও কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে উৎপাদন ব্যয়। কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সার ও অন্যান্য উপকরণের দাম এবং শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। ফলে ধানের ভালো ফলন পেলেও নিট লাভ প্রত্যাশার তুলনায় কম হতে পারে।
কৃষক সবুজ মিয়া জানান, শ্রমিকদের দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মজুরি দিতে হচ্ছে। তাঁর মতে, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের দাম বাড়লে কৃষকেরা আরও স্বস্তি পেতেন।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট গ্রামের কৃষক আদিলুর রহমান জানান, ছয় বিঘা জমিতে আগাম আমন চাষে এ বছর তাঁর ব্যয় হয়েছে ৮৭ হাজার টাকা। আগের বছর একই জমিতে ব্যয় হয়েছিল ৭১ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক বছরে তাঁর উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ১৬ হাজার টাকা।
এই চিত্র দেখায়, কৃষকের আয় নির্ভর করছে শুধু ফলনের ওপর নয়; উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
বন্যার প্রভাব কম থাকায় স্বস্তি
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, এ বছর বন্যার প্রভাব তুলনামূলক কম থাকায় আগাম আমনের উৎপাদন আশানুরূপ হয়েছে। উঁচু জমিতে চাষ করা আগাম জাতের ধান ইতোমধ্যে কাটা শুরু হয়েছে। সাধারণ আমন ধান কাটার মৌসুম নভেম্বরের শুরুতে আরও বিস্তৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ধান কাটার পর আলু, ভুট্টা ও বিভিন্ন শীতকালীন ফসল আবাদ করতে পারলে একই জমি থেকে একাধিকবার আয়ের সুযোগ পাবেন কৃষকেরা। তবে এ ক্ষেত্রে ফসলের বাজারদর, উৎপাদন ব্যয় এবং সময়মতো কৃষি উপকরণ পাওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ফলনের পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার প্রত্যাশা
রংপুরের আগাম আমন মৌসুমে কৃষকদের অভিজ্ঞতা একদিকে আশাব্যঞ্জক ফলনের চিত্র তুলে ধরছে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয়ের চাপও সামনে আনছে। ভালো ফলন কৃষকের জন্য ইতিবাচক হলেও বাজারে ন্যায্যমূল্য না পেলে সেই সুফল সীমিত হয়ে যেতে পারে।
কৃষকদের প্রত্যাশা, ধানের উপযুক্ত দাম পাওয়ার পাশাপাশি সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকলে তাঁদের লাভের পরিমাণ বাড়বে। ধান কাটার পর শীতকালীন ফসল আবাদ করে বাড়তি আয়ের যে পরিকল্পনা তাঁরা করছেন, তার সাফল্যও নির্ভর করবে উৎপাদন ব্যয় ও বাজার পরিস্থিতির ওপর।


