ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স আবেদন চূড়ান্ত মূল্যায়নে, সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড

সংবাদ সারাদিন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৬ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৬ আগস্ট ২০২৬

দেশে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর জন্য দ্বিতীয় দফায় জমা পড়া আবেদনগুলোর মূল্যায়ন এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কমিটি তাদের প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে জমা দেবে। গভর্নর প্রতিবেদনটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপন করবেন এবং পর্ষদই লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, আবেদনগুলোর মূল্যায়ন প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে কতটি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স পেতে পারে, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। আবেদনকারীদের কারিগরি সক্ষমতা, আর্থিক সামর্থ্য, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, মালিকানা কাঠামো এবং নীতিমালার শর্ত পূরণের বিষয়গুলো যাচাই করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সের জন্য দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে ১২টি প্রতিষ্ঠান আবেদন জমা দিয়েছিল। আবেদনকারীদের মধ্যে মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, টেলিযোগাযোগ কোম্পানি, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান, শিল্পগোষ্ঠী এবং বিদেশি অংশীদারত্বে গড়ে ওঠা প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

আবেদনকারীদের মধ্যে বিকাশের অংশীদারদের প্রস্তাবিত বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক, রবি আজিয়াটার বুস্ট, বাংলালিংক ও স্কয়ারের যৌথ উদ্যোগে প্রস্তাবিত নোভা ডিজিটাল ব্যাংক, আকিজ রিসোর্সের মুনাফা ইসলামী ডিজিটাল ব্যাংক এবং ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশীদারত্বে গড়ে ওঠা বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। কয়েকটি আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিদেশে ডিজিটাল ব্যাংক বা প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবা পরিচালনার অভিজ্ঞতাও রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট নতুন করে ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার আবেদন আহ্বান করেছিল। প্রথমে ১ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদন গ্রহণের সময় নির্ধারণ করা হলেও পরে সময়সীমা বাড়িয়ে ২ নভেম্বর পর্যন্ত করা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদনকারীদের প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও ব্যবসায়িক প্রস্তাব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্টে জমা দিতে হয়।

আবেদনগুলো মূল্যায়নের জন্য কারিগরি, ব্যবসায়িক ও আর্থিক বিষয় যাচাইয়ে পৃথক কমিটি কাজ করছে। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছিল, টেকনিক্যাল ইভালুয়েশন কমিটি, বিজনেস ইভালুয়েশন কমিটি এবং ফাইন্যান্সিয়াল ইভালুয়েশন কমিটির মাধ্যমে ধাপে ধাপে আবেদনগুলো যাচাই করা হচ্ছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেওয়ার আগে পর্ষদের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশোধিত নীতিমালায় ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ৩০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের নীতিমালায় এ মূলধনের পরিমাণ ছিল ১২৫ কোটি টাকা। একই সঙ্গে আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা ও স্পনসরদের আর্থিক সক্ষমতা, অর্থের উৎস, ঋণখেলাপি পরিস্থিতি, নাগরিকত্ব এবং মালিকানা কাঠামো যাচাইয়ের শর্ত কঠোর করা হয়েছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকের মতো শাখা, উপশাখা বা কাউন্টারের মাধ্যমে গ্রাহকসেবা দেবে না। ব্যাংকটির কার্যক্রম মূলত মোবাইল অ্যাপ, ইন্টারনেট এবং অন্যান্য ডিজিটাল যন্ত্রের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য একটি প্রধান কার্যালয় থাকলেও সাধারণ গ্রাহকদের জন্য কোনো প্রচলিত শাখা থাকবে না।

ডিজিটাল ব্যাংকের নিজস্ব এটিএম, নগদ জমা দেওয়ার মেশিন বা প্রচলিত প্লাস্টিক কার্ড থাকবে না। তবে গ্রাহকদের জন্য ভার্চুয়াল কার্ড, কিউআর কোড এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন আর্থিক পণ্য চালু করা যাবে। প্রয়োজনে গ্রাহকেরা অন্যান্য ব্যাংকের এটিএম ও এজেন্ট ব্যাংকিং অবকাঠামো ব্যবহার করতে পারবেন।

এ ধরনের ব্যাংক প্রধানত ব্যক্তি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা দেওয়ার দিকে গুরুত্ব দেবে। তবে ডিজিটাল ব্যাংক ঋণপত্র বা এলসি খুলতে পারবে না এবং বড় ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিতে পারবে না। নীতিমালা অনুযায়ী, ছোট আকারের ঋণ, আমানত, অর্থ স্থানান্তর এবং প্রবাসী আয় গ্রহণের মতো সেবা দেওয়ার সুযোগ থাকবে।

এর আগে ২০২৩ সালে প্রথম দফায় ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য ৫২টি আবেদন জমা পড়েছিল। যাচাই-বাছাই শেষে নগদ ও কড়ি ডিজিটাল ব্যাংকসহ কয়েকটি প্রস্তাব নীতিগত অনুমোদন পেলেও প্রক্রিয়াটি বিতর্কের মুখে পড়ে। পরে নগদ ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স স্থগিত করা হয় এবং পুরো লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

বর্তমান মূল্যায়নে কোনো প্রতিষ্ঠান সব শর্ত পূরণ করলে লাইসেন্সের জন্য বিবেচিত হতে পারে। আবার অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যোগ্য হতে পারে কিংবা কোনো আবেদনই প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ না করার সম্ভাবনাও রয়েছে। এ কারণে মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের আগে লাইসেন্সের সংখ্যা বা কার্যক্রম শুরুর সময় নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *