সংবাদ সারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গড়ে ওঠা ব্যাপক অর্থ পাচারের ধারাবাহিকতা পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। যদিও বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে এই অবৈধ প্রবণতা কিছুটা কমেছে, তবুও দেশের বিভিন্ন আর্থিক খাত ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী অর্থ পাচারের সেই গোপন ধারা এখনো পুরোপুরি থামানো সম্ভব হয়নি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর সূত্রে এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান বা ব্যাংক হিসাবের নজরদারির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পারস্পরিক অসহযোগিতামূলক মনোভাব দূর করে কার্যকর সমন্বয় বাড়াতে হবে এবং দেশেই নিরাপদ বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের সঞ্চয় ও উদ্যোক্তাদের মূলধন বিদেশে পাচার হয়ে বিভিন্ন দেশে বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক সম্পদে রূপান্তরিত হচ্ছে, যার ফলে দেশের অভ্যন্তরে নতুন কারখানা ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের গতি মারাত্মকভাবে মন্থর হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যভিত্তিক অবৈধ উপায়ে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৬শ ৮৩ কোটি ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৩ হাজার ৮শ কোটি টাকা) পাচার হয়েছে। এছাড়া অর্থনীতির শ্বেতপত্র কমিটির বিশ্লেষণে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে প্রায় ১৬শ কোটি ডলার পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। বিএফআইইউর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সন্দেহজনক লেনদেনের রিপোর্ট ৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩০ হাজার ১৯৯টিতে দাঁড়িয়েছে। বাণিজ্য ক্ষেত্রে ওভার ইনভোয়েসয়িং, আন্ডার ইনভয়েসিং, ভুয়া আমদানি-রপ্তানি এবং হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম ব্যবহার করে সাইপ্রাস, ফিলিপাইন, ভারত, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসসহ বিভিন্ন অফশোর এখতিয়ারে অর্থ পাচার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
অর্থ পাচারের এই মহাব্যাধি রোধে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর স্থায়ী সমাধানের জন্য কাঠামোগত ও নীতিগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাণিজ্য খাতে চালান জালিয়াতি ও কর ফাঁকি রোধে এনবিআরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অবিলম্বে কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড (সিআরএস)-এ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ এবং সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন যে, অর্থ পাচার রোধের পাশাপাশি দেশের ভেতরে উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগের আকর্ষণীয়, নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা না গেলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা অসম্ভব। কর ও শিল্পনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসার অনুমোদন সহজ করার মাধ্যমে দেশীয় সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল খাতে ফিরিয়ে আনতে পারলে তবেই অবৈধভাবে অর্থ বিদেশে পাচারের প্রবণতা কার্যকরভাবে রোধ করা সম্ভব হবে।


