রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলার আনতে নিবন্ধনের আওতায় আসছে ব্যাটারিচালিত রিকশা: থাকছে জোনভিত্তিক রুট ও জিপিএস নজরদারি

সংবাদ সারাদিন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর | আপডেট: ২৯  সেপ্টেম্বর ২০২৬  

রাজধানীর যাতায়াত ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে নৈরাজ্য ও তীব্র যানজটের কারণ হয়ে দাঁড়ানো ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোকে অবশেষে একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি এবং শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসার যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরীকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট জোনে বিভক্ত করে নিবন্ধন প্রদান, জিপিএস ট্র্যাকিং ও জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে এই যানগুলোর চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সভাপতিত্বে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের একাধিক সভায় এই সংক্রান্ত ‘ই-মোবিলিটি ও ব্যাটারি সোয়াপিং সিস্টেম রোল-আউট পরিকল্পনা (ঢাকা শহর)’ নথির চূড়ান্ত রূপরেখা অনুমোদনের পথে রয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে রাজধানী ঢাকায় কোনো ধরনের সরকারি নিবন্ধন বা বৈধতা ছাড়াই আনুমানিক ১৫ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে, যা সারা দেশের হিসাব ধরলে প্রায় ৪০ লাখে গিয়ে দাঁড়ায়। এই বিপুলসংখ্যক যান নিয়ন্ত্রণহীনভাবে প্রধান সড়কগুলোতে চলাচল করার ফলে একদিকে যেমন প্রায়শই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটছে, অন্যদিকে তীব্র যানজটে স্থবির হয়ে পড়ছে নগরজীবন। নতুন প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার মোট ৩ হাজার ৪২০ কিলোমিটার ফিডার সড়কে (প্রধান সড়ক বাদে অভ্যন্তরীণ ও সংযোগ সড়কে) পর্যায়ক্রমে মোট আট লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হবে। এর মধ্যে দুই সিটিতে চার লাখ করে রিকশা বরাদ্দ থাকবে এবং এগুলো কোনো অবস্থাতেই মূল সড়কে প্রবেশ করতে পারবে না।

চলাচল ব্যবস্থাপনাকে ত্রুটিমুক্ত করতে ঢাকাকে মোট আটটি নির্দিষ্ট জোনে (উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে চারটি করে) ভাগ করা হবে। এক জোনের নিবন্ধিত রিকশা অন্য জোনে প্রবেশ করতে পারবে না। এই নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে অনলাইনে জিপিএস ও জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি এবং অফলাইনে রিকশার বডিতে নির্দিষ্ট রঙের প্রলেপ ও জোনভিত্তিক কোডযুক্ত নম্বরপ্লেট ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি, বুয়েট অনুমোদিত নতুন আধুনিক ব্যাটারিচালিত রিকশা নিবন্ধনের মাধ্যমে সড়কে নামানো হবে এবং পুরনো রিকশাগুলো বিশেষ এক্সচেঞ্জ কর্মসূচির মাধ্যমে বদলে নতুন গাড়ি দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে, যেখানে পুরনো গাড়ির মূল্য নতুন দামের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি দুই সিটের এসব আধুনিক রিকশার দাম ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। একজন নাগরিক তার জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচটি রিকশার নিবন্ধন পাওয়ার সুযোগ পাবেন এবং প্রতিটি রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।

নিবন্ধন ও চালকদের লাইসেন্স প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, সিটি করপোরেশন এলাকায় দুই সিটের এসব রিকশার জন্য এককালীন ১০ হাজার টাকা নিবন্ধন ফি এবং প্রতি বছর ৩ হাজার টাকা নবায়ন ফি দিতে হবে। এছাড়া ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী যেকোনো নাগরিক মাত্র ৫০০ টাকা ফি দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে পাঁচ বছর মেয়াদি চালকের বিশেষ লাইসেন্স সংগ্রহ করতে পারবেন এবং তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, যত্রতত্র অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাটারি চার্জিংয়ের হিড়িক বন্ধ করতে নির্দিষ্ট চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজ চালুর পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং দ্রুততম সময়ে (১ থেকে ১.৫ মিনিটে) ডিসচার্জ ব্যাটারি বদলে ফুল চার্জড ব্যাটারি লাগানোর ‘ব্যাটারি সোয়াপিং স্টেশন’ চালুর আধুনিক পরিকল্পনা রয়েছে। এই বহুমুখী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর গণপরিবহন খাতে এক বিশাল ইতিবাচক শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *