১৪ বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত, ১৩০ বার পিছিয়েছে প্রতিবেদন জমার তারিখ; নিম্ন আদালতে পরবর্তী দিন ৫ নভেম্বর
সংবাদ সারাদিন ডেস্ক | ঢাকা | ২৭ অক্টোবর ২০২৬
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্তে নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাই-বাছাই করছে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্যের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। এ কারণে তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করে আরও সময় চেয়েছে বিশেষ তদন্ত দল।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) আলোচিত এই হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টি হাইকোর্টে বিবেচনার জন্য নির্ধারিত ছিল। তবে এর আগের দিন সোমবার (২৬ অক্টোবর) তদন্ত সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত সময়ের আবেদন জানায় টাস্কফোর্স। তদন্তের বর্তমান অবস্থা ও নতুন তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি অগ্রগতি প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে বলে সময় নিউজের প্রতিবেদনে জানানো হয়।
দীর্ঘ ১৪ বছরেও বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটিত না হওয়ায় নতুন তথ্যের গুরুত্ব এবং তদন্ত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা আবারও আলোচনায় এসেছে।
ট্রাইব্যুনালের অনুসন্ধানে নতুন সূত্র
গত ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, অন্য একটি মামলার তদন্তের সময় কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) পর্যালোচনা করতে গিয়ে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার সূত্র পাওয়া গেছে।
তবে ওই ব্যক্তির নাম বা পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। প্রধান কৌঁসুলি জানিয়েছিলেন, তথ্যগুলো আরও যাচাই করা হবে এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) জানানো হবে।
উল্লেখ্য, কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য বা সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার সূত্র পাওয়া মানেই হত্যাকাণ্ডে তাঁর অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। এ বিষয়ে তদন্তকারীদের যাচাই এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সর্বশেষ হাইকোর্টে জমা দেওয়া অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্যগুলো এখন যাচাই-বাছাই করছে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স।
বিচার চেয়ে ট্রাইব্যুনালে পরিবারের আবেদন
এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ দাখিল করে নিহতদের পরিবার।
পরিবারের পক্ষে মেহেরুন রুনির ভাই এবং মামলার বাদী নওশের আলম রোমান ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলির কাছে আবেদনটি জমা দেন।
অভিযোগে দীর্ঘদিনেও হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
আবেদন গ্রহণের পর ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি জানান, মামলাটি ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি অনুসন্ধানে প্রাসঙ্গিক কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তা সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থাকে সরবরাহ করা হবে।
একাধিক সংস্থার তদন্তেও মেলেনি সমাধান
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি।
ঘটনার পর মেহেরুন রুনির ভাই নওশের আলম রোমান বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন।
শুরুতে থানা পুলিশ মামলাটির তদন্ত শুরু করে। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। কিন্তু তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্টের নির্দেশে মামলাটি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) কাছে হস্তান্তর করা হয়।
দীর্ঘ সময় তদন্ত করেও র্যাব চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি।
পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট র্যাবকে তদন্তের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন।
হাইকোর্টের নির্দেশ অনুসারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চার সদস্যের বিশেষ তদন্ত দল গঠন করে। পিবিআই প্রধানকে ওই টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক করা হয়।
বর্তমানে এই টাস্কফোর্সের তত্ত্বাবধানেই মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তদন্ত শেষ করতে বারবার সময় বৃদ্ধি
টাস্কফোর্স গঠনের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করা সম্ভব না হওয়ায় একাধিকবার আদালতের কাছে সময় চাওয়া হয়েছে।
সর্বশেষ গত ২৬ এপ্রিল ২০২৬ হাইকোর্ট বিশেষ তদন্ত দলকে আরও ছয় মাস সময় দেন। এর আগে আদালতে দাখিল করা অগ্রগতি প্রতিবেদন ও শুনানিতে তদন্তের পুরোনো তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের জটিলতা এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের প্রতিবন্ধকতার বিষয় উঠে আসে।
এদিকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি মহানগর হাকিম আদালতে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয় পিবিআই। পরে আদালত আগামী ৫ নভেম্বর নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন।
এ নিয়ে নিম্ন আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্ধারিত তারিখ মোট ১৩০ বার পিছিয়েছে।
হাইকোর্টে টাস্কফোর্সের তদন্তের অগ্রগতি ও সময় বাড়ানোর আবেদন এবং মহানগর হাকিম আদালতে মূল মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কার্যক্রম পৃথক বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ।
১৪ বছরের অপেক্ষা, এখনো অমীমাংসিত হত্যার রহস্য
সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজে বহুল আলোচিত একটি ঘটনা। দীর্ঘ সময়ে তদন্তের দায়িত্ব একাধিক সংস্থার হাতে গেলেও হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, পরিকল্পনা এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি তদন্তকারীরা।
এ অবস্থায় ট্রাইব্যুনালের অনুসন্ধানে পাওয়া নতুন তথ্য যাচাইয়ের উদ্যোগ তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এসব তথ্য থেকে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হবে কি না, তা নির্ভর করছে তদন্তের ফলাফল ও প্রমাণের ওপর।
মামলাটির ভবিষ্যৎ অগ্রগতি এখন নির্ভর করছে নতুন তথ্য যাচাই, টাস্কফোর্সের চূড়ান্ত প্রতিবেদন এবং আদালতের পরবর্তী নির্দেশনার ওপর।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও সাংবাদিক দম্পতি হত্যার বিচারিক প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাই তদন্ত কবে শেষ হবে এবং প্রকৃত অপরাধীদের কখন বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হবে—সেই প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।
সংবাদ সারাদিন | জাতীয় সংবাদ | আইন ও আদালত


