৯ মাসে মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের শিকার ১০৯ শিশু, বিচার নিয়ে প্রশ্ন

সংবাদ সারাদিন ডেস্ক | ২৬ অক্টোবর ২০২৬

দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় ছেলে শিশুদের যৌন নির্যাতনের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে মানবাধিকার সংস্থা জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্সের (জেএমবিএফ) এক প্রতিবেদনে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ৯ মাসে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে সংঘটিত ৭২টি ঘটনায় অন্তত ১০৯ ছেলে শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে। এসব ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

জেএমবিএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ছেলে শিশুদের ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ১৩১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় মোট ১৭১ শিশু ভুক্তভোগী। তাদের মধ্যে ১৬১ জন ধর্ষণ এবং ১০ জন ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সংস্থাটির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর প্রায় ৫৫ শতাংশ ঘটেছে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে। মোট ভুক্তভোগীর প্রায় ৬৪ শতাংশ এসব ঘটনার শিকার হয়েছে। এ ছাড়া ভুক্তভোগী ১৭১ শিশুর মধ্যে ১২২ জন মাদ্রাসাশিক্ষার্থী।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১৩১টি ঘটনার মধ্যে ১১৭টিতে মামলা বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। তবে প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় ১১৬টি ঘটনা তদন্তাধীন ছিল। ফলে অভিযোগের পর কার্যকর আইনি প্রতিকার এবং বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

রাজধানীর বনশ্রীতে গত মে মাসে একটি মাদ্রাসা থেকে ১০ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। ওই ঘটনায় যৌন নির্যাতন ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন শিশুটির মা। একই প্রতিষ্ঠানের এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়। তবে মামলাটির সর্বশেষ বিচারিক অগ্রগতি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

বিচারপ্রক্রিয়ায় বড় বাধা সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ছেলে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসা পরীক্ষা, আলামত সংরক্ষণ এবং ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসানের মতে, ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে মেডিকেল ও ডিএনএ পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহের পদ্ধতি সম্পর্কে পৃথক ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার ঘাটতি রয়েছে। এতে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।

শাস্তির পাশাপাশি প্রতিরোধেও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, যৌন নির্যাতনের ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম শিশুদের নিরাপদ ও অনিরাপদ স্পর্শ সম্পর্কে সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে শিক্ষক-অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন তিনি, যাতে শিশুরা ভয় ছাড়াই নির্যাতনের অভিযোগ জানাতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ছেলে শিশু সামাজিক সংকোচ, ভয় কিংবা হুমকির কারণে নির্যাতনের কথা প্রকাশ করতে পারে না। ফলে অনেক ঘটনা আড়ালে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এ অবস্থায় মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ তদন্ত, শিশুদের চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিশুদের জন্য নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *