সংবাদ সারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ৫ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৫ আগস্ট ২০২৬
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত একটি প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে হট্টগোল ও প্রতিবাদের ঘটনায় নিজেকে ‘লজ্জিত ও ব্যথিত’ বলে মন্তব্য করেছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। প্রামাণ্যচিত্রে শহীদ আবু সাঈদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং অভ্যুত্থানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়নি বলে অভিযোগ করেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন জুলাই যোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য ও এনসিপির নেতাকর্মীরা। পরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে প্রামাণ্যচিত্রটি সংশোধনের আশ্বাস দেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রামাণ্যচিত্রকে কেন্দ্র করে হট্টগোল, স্লোগান এবং একদল অংশগ্রহণকারীর অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগের ঘটনায় গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। অনুষ্ঠানে সৃষ্ট পরিস্থিতি দেখে তিনি নিজেকে ‘লজ্জিত ও ব্যথিত’ বলে মন্তব্য করেন।
বুধবার, ৫ আগস্ট রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের সম্মানে সংবর্ধনা ও আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
জাতীয় সংগীত, ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে পাঠ এবং জুলাই শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালনের পর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। প্রামাণ্যচিত্রটি শেষ হওয়ার পরই উপস্থিত দর্শকদের একটি অংশ এর বিষয়বস্তু নিয়ে আপত্তি জানাতে শুরু করেন।
প্রতিবাদকারীদের অভিযোগ, প্রামাণ্যচিত্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। বিশেষ করে রংপুরে পুলিশের সামনে বুক পেতে দাঁড়ানো শহীদ আবু সাঈদের ছবি না থাকা, বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা উপস্থাপিত না হওয়া এবং ৩ আগস্টের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো বাদ পড়ার অভিযোগ ওঠে।
একপর্যায়ে জুলাই অভ্যুত্থানে আহত কয়েকজন, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি—এনসিপির নেতাকর্মীদের একটি অংশ ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তায় নিয়োজিত সদস্যরা মঞ্চ ও মিলনায়তনের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন। হট্টগোলের মধ্যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন বিদেশি অতিথিকেও স্থান ত্যাগ করতে দেখা যায়।
পরিস্থিতি শান্ত করার উদ্যোগ নিয়ে এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন মঞ্চে উঠে বক্তব্য দেন। তিনি প্রামাণ্যচিত্রে অসংগতি থাকার অভিযোগ স্বীকার করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে জবাবদিহি চাওয়া এবং ভুলগুলো সংশোধনের দাবি জানান। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক দিবস ও শহীদ পরিবারের প্রতি সম্মান রেখে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
পরে আখতার হোসেনসহ এনসিপির কয়েকজন নেতা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির অনুমতি নিয়ে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান মঞ্চে উঠে প্রামাণ্যচিত্রের কারণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রামাণ্যচিত্রের অসংগতিগুলো পর্যালোচনা এবং দ্রুত সংশোধনের আশ্বাস দেন।
পরবর্তী সময়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রামাণ্যচিত্রে ভুল থাকার বিষয়টি তিনি নিজেও লক্ষ্য করেছেন। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রতীক আবু সাঈদের ছবি না থাকাকে তিনি বড় ধরনের ভুল হিসেবে উল্লেখ করেন। খালেদা জিয়ার ছবিও প্রামাণ্যচিত্রে না থাকার কথা তুলে ধরেন তিনি।
তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ ও সংশোধনের আশ্বাস দেওয়ার পরও হট্টগোল অব্যাহত রাখা এবং সংসদের মতো অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে যাওয়াকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মন্তব্য করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। তাঁর মতে, বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতিতে জাতীয় অনুষ্ঠানে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় দেশের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে।
তিনি বলেন, সকালে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধনী আয়োজনে জাতীয় ঐক্যের প্রতিফলন দেখা গেলেও বিকালের অনুষ্ঠানে সেই পরিবেশ বজায় থাকেনি। মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক হলেও জাতীয় স্বার্থ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সবাইকে সংযম ও ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বক্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারের দেখভাল এবং আহত ও শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। জুলাই যোদ্ধাদের নিজেদের ন্যায্য দাবি নিয়ে মন্ত্রীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হলে তা জাতির জন্য লজ্জাজনক হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে জুলাই শহীদ পরিবারের প্রতিনিধি ও আহত জুলাই যোদ্ধারা নিজেদের অভিজ্ঞতা এবং প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। পরে তাঁদের কয়েকজনের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। প্রামাণ্যচিত্রের যেসব অংশ নিয়ে আপত্তি উঠেছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংশোধন করার কথা জানিয়েছে আয়োজক মন্ত্রণালয়।


