নিজস্ব প্রতিবেদক | সংবাদ সারাদিন
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির (২৭) রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে নতুন মোড় নিয়েছে। এ ঘটনায় দিশা নামে এক তরুণীকে গ্রেপ্তার করেছে নৌ পুলিশ। অন্যদিকে, মামলার সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার তাহসিফের বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, তাহসিফের মৃত্যুর আগে তাঁর সঙ্গে কারা ছিলেন, কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছিল—এসব বিষয় সামনে রেখে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, প্রযুক্তিগত তথ্য ও বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হয় মরদেহ
গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে রাজধানীর উত্তরখান থানাধীন রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। এর আগে ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে বের হওয়ার পর তিনি নিখোঁজ হন।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন সন্ধ্যা ৬টার পর দীপ নামে তাঁর এক পরিচিত জুনিয়রের সঙ্গে দেখা করতে বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। এরপর রাতে বাসায় না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, রাত ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে তাহসিফের ফোন থেকে তাঁর মায়ের কাছে মেসেঞ্জারে একটি ভয়েস বার্তা আসে। সেখানে তিনি বাসায় ফেরার কথা জানান। কিন্তু এরপর আর তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পরদিন বিকেলে তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের খবর পায় পরিবার। পরে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। এ ঘটনায় তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
বন্ধু দীপকে ঘিরে তদন্তে সন্দেহ
তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর সঙ্গে সর্বশেষ যোগাযোগ থাকা ব্যক্তিদের খুঁজতে গিয়ে আলোচনায় আসেন আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ। তিনি তাহসিফের বন্ধুস্থানীয় জুনিয়র এবং ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
গত ২৯ অক্টোবর রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের একটি বাসা থেকে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৩০ অক্টোবর টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকা থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি কালো রঙের সুজুকি জিক্সার ১৫০ মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। দীপ সেটিকে তাহসিফের মোটরসাইকেল বলে শনাক্ত করেন।
দীপের দাবি অনুযায়ী, ঘটনার রাতে তিনি ও তাহসিফ টঙ্গীর ওই এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে কয়েকজন তাঁদের ধাওয়া করলে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। তবে তাঁর এই বক্তব্যের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।
সিসিটিভি ফুটেজে নতুন তথ্য
তদন্তের অংশ হিসেবে বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করছেন কর্মকর্তারা। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, একটি ফুটেজে ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত তাহসিফের সঙ্গে দীপের চলাচলের তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া উত্তরার একটি রেস্তোরাঁর লিফটের সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফ ও এক তরুণীকে দেখা যায়। পরে হেলমেট পরা অবস্থায় দীপ সেখানে উপস্থিত হলে তিনজন একসঙ্গে লিফটে ওঠেন। তাঁরা সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থান করেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
এরপর তাঁরা মোটরসাইকেলে করে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যাওয়ার আগে তাঁদের মধ্যে কী ঘটেছিল, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
দিশা নামে তরুণী গ্রেপ্তার
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তের ধারাবাহিকতায় ৩১ অক্টোবর রাতে দিশা নামে এক তরুণীকে গ্রেপ্তার করে নৌ পুলিশ। ১ নভেম্বর প্রকাশিত সংবাদে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, দীপের দেওয়া বক্তব্য, পরিবারের অভিযোগ, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য আলামত যাচাইয়ের পাশাপাশি দিশার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে দিশার সঙ্গে তাহসিফের সম্পর্কের প্রকৃতি, হত্যাকাণ্ডে তাঁর সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কিংবা তাঁকে গ্রেপ্তারের পেছনে পুলিশের বিস্তারিত বক্তব্য এখনো স্পষ্ট নয়। এসব বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর
৩১ অক্টোবর তাহসিফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে দীপকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ।
শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস তাঁর চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় দীপের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। রিমান্ডে তাঁকে আরও বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
তদন্তে যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় এখনো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।
১. ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত কারা ছিলেন?
২. উত্তরার রেস্তোরাঁ থেকে বের হওয়ার পর তাঁরা কোথায় গিয়েছিলেন?
৩. টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যাওয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল?
৪. দীপের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য আলামতের কোনো অসংগতি রয়েছে কি না?
৫. দিশার সঙ্গে তাহসিফের কী ধরনের যোগাযোগ ছিল এবং এ ঘটনায় তাঁর ভূমিকা কী?
৬. তুরাগ নদে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী এবং এর পেছনে অন্য কেউ জড়িত কি না?
তদন্তকারীরা এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও ফরেনসিক আলামত যাচাই করছেন।
সুষ্ঠু তদন্তের দাবি পরিবারের
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তাঁর ছেলে সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতেন। এমন ঘটনার শিকার হওয়া পরিবার মেনে নিতে পারছে না।
এদিকে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের সংগঠন রাওয়া (RAOWA) তাহসিফের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঘটনার নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটিও (HRSS) স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় দীপের রিমান্ড, দিশার গ্রেপ্তার এবং নতুন সিসিটিভি ফুটেজ তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, সম্ভাব্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ঘটনার পেছনের রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে পরিবার ও স্বজনেরা।


