নিজস্ব প্রতিবেদক | সংবাদ সারাদিন
ঢাকা, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট মাসে ৭৪৪টি মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। এসব অভিযানে মোট ২ কোটি ৮৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সময়ে সাতজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর বুধবার প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষের আইন প্রয়োগ ও তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
আগস্টে সর্বোচ্চ অভিযান
বিএফএসএর মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগস্টে প্রধান কার্যালয় এবং জেলা ও মহানগর কার্যালয় মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৯৭টি অভিযান পরিচালিত হয়। এ মাসে জরিমানা করা হয় ৮৫ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা।
জুলাইয়ে মোট ১১৯টি অভিযানে ৪৮ লাখ ২৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সেপ্টেম্বরে অভিযান পরিচালিত হয় ৭৯টি, আর জরিমানার পরিমাণ ছিল ৫১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, ফেব্রুয়ারিতে আটটি অভিযানে ছয় লাখ টাকা এবং মার্চে ৮৩টি অভিযানে ৪০ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এপ্রিলে ৮৯টি অভিযানে ১১ লাখ ৭০ হাজার টাকা, মে মাসে ৮৫টি অভিযানে ২২ লাখ টাকা এবং জুনে ৮৪টি অভিযানে ১৯ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
যেসব অনিয়ম উঠে এসেছে
অভিযানে রাজধানীর বিভিন্ন খাদ্য প্রতিষ্ঠানে অনিবন্ধিতভাবে ব্যবসা পরিচালনা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি, লেবেলবিহীন মাছ-মাংস ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী সংরক্ষণ এবং খাদ্যকর্মীদের স্বাস্থ্যসনদ ও পেস্ট কন্ট্রোলের প্রমাণপত্র না থাকার মতো অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে।
রাজধানীর বাইরের বিভিন্ন জেলায় পরিচালিত অভিযানে পায়ে মাড়িয়ে চানাচুর তৈরি, পোড়া তেল ব্যবহার, অনুমোদনহীন রাসায়নিক রং প্রয়োগ, উৎপাদনস্থলে তেলাপোকা ও ছারপোকার উপস্থিতি, অনুমোদনহীন ঘি ব্যবহার এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাদ্য উৎপাদনের ঘটনাও উঠে এসেছে।
এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে জরিমানা ও মামলা করা হয়েছে বলে বাসসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষায় জোর
খাদ্যের মান ও নিরাপত্তা যাচাইয়ে নমুনা পরীক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা করেছে বিএফএসএ। পরীক্ষার আওতায় ছিল বোতলজাত পানি, ভোজ্যতেল, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, দই, গুঁড়া মসলা, শিশুখাদ্য এবং বেকারি পণ্য।
নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে খাদ্যপণ্যের মান যাচাই, সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়। তবে পরীক্ষিত নমুনার সংখ্যা একা দিয়ে বাজারে ভেজাল বা অনিরাপদ খাদ্যের সামগ্রিক হার নির্ধারণ করা যায় না।
নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা
বিএফএসএর সদস্য (আইন ও নীতি) এবং চেয়ারম্যানের চলতি দায়িত্বে থাকা মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বাসসকে জানান, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে চলমান কার্যক্রম আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা পর্যায় থেকে দেশব্যাপী অভিযান ও মনিটরিং বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও সহায়তার বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে।
তিনি জানান, খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনের প্রতিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি খাদ্যের মূল উপাদানের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং অবৈধ রং, গন্ধ ও ক্ষতিকর অ্যাডিটিভসের ব্যবহার বন্ধে গবেষণা ও কারিগরি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে প্রয়োজন ধারাবাহিক তদারকি
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নিয়মিত পরিদর্শন, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা, খাদ্য ব্যবসায়ীদের বিধি মেনে চলা এবং ভোক্তাদের সচেতনতার গুরুত্ব রয়েছে। অভিযান ও জরিমানা অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অংশ হলেও দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার থালা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বাস্থ্যবিধি ও মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি।
খাদ্যে অনিয়ম প্রতিরোধে নিয়মিত তদারকি, নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার ফলাফল এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


