সংবাদ সারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর | আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরের ঐতিহ্যবাহী রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার নাশকতামূলক ঘটনায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অভিযান চালিয়ে চারজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করেছে শাহ আলী থানা পুলিশ। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে থানা পুলিশের পক্ষ থেকে চারজনকে গ্রেপ্তারের এই তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বিস্তারিত পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। এদিকে এই ঘটনার সময় খোদ পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিল বলে গণমাধ্যমের সামনে অকপটে স্বীকার করেছেন শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর হোসেন, যদিও পুলিশের চোখের সামনেই এত বড় অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরেও কেন তৎক্ষণাৎ কাউকে আটক করা হলো না, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট বা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি।
থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে যে, গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অর্থের বিনিময়ে ভাড়া খেটে এই আকস্মিক হামলা ও ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছে এবং তাদের ইতোমধ্যে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাতে অর্থাৎ ১২টা থেকে ২টার মধ্যে মিরপুর-১ নম্বরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে অতর্কিত এই হামলা চালায় মুখোশ পরিহিত ২০০ থেকে ২৫০ জনের একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল, যারা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জোরপূর্বক প্রবেশ করে প্রথমে দায়িত্বরত দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে ফেলে। এরপর ক্লিনিক চত্বরে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালানোর পাশাপাশি ভারী যন্ত্রপাতি ও বুলডোজারের মতো সরঞ্জাম ব্যবহার করে একটি পাকা ভবনসহ মোট তিনটি সেমিপাকা ভবন সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেয়। রাড্ডা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের দেওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে থাকা জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, মূল্যবান ভ্যাকসিন, সরকারি টিকাদান কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ রেজিস্টার ও নথিপত্র, পরিবার পরিকল্পনার বিভিন্ন সামগ্রী, আধুনিক আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, ফ্রিজ, এসি এবং ক্যাশ বাক্সে থাকা নগদ টাকা দেদারসে লুট করে নিয়ে গেছে, যার ফলে সবমিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
এই জঘন্য ঘটনার পর রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বাদী হয়ে শাহ আলী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন, যেখানে মিরপুরের স্থানীয় বিএনপি নেতা মো. হানিফ মিয়াকে প্রধান আসামি করে মোট ২০০ থেকে ২৫০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে অনধিকার প্রবেশ, লুটপাট, প্রাণনাশের হুমকি এবং কোটি টাকার বেশি সম্পদ ধ্বংসের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হলেও প্রধান অভিযুক্ত হানিফ মিয়া এই ঘটনার সঙ্গে তাঁর বিন্দুমাত্র সংশ্লিষ্টতা নেই বলে জোরালোভাবে তা অস্বীকার করেছেন। তবে ঘটনার পর থেকে পুলিশের রহস্যজনক ভূমিকা ও দায়িত্বহীনতা নিয়ে জনমনে তীব্র প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে; কারণ ঘটনার পরপরই ওসি জাহাঙ্গীর গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে পুলিশ রাতে গিয়ে কেবল উৎসুক জনতা দেখেছে এবং পরবর্তীতে মামলা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, অথচ আজ তিনি নিজেই স্বীকার করলেন যে ভাঙচুরের সময় পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিল। পুলিশ প্রশাসনের চোখের সামনে এমন ব্যাপক তাণ্ডব ও স্থাপনা ধ্বংসের কাজ চললেও তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার ঘটনায় তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এর আগে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান ক্ষতিগ্রস্ত ঘটনাস্থল সরেজমিন পরিদর্শন করে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে দোষীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের কঠোর নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন যে, জমি বা স্থাপনা নিয়ে যেকোনো ধরনের বিরোধ বা জটিলতা থাকলে তা সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে, কোনোভাবেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। উল্লেখ্য, ১৯৭৬ সাল থেকে দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দী ধরে সরকারের সঙ্গে অত্যন্ত সফল অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এই প্রতিষ্ঠানটি মিরপুর এলাকার দরিদ্র ও নিম্ন-আয়ের সাধারণ মানুষের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি কল্যাণ এবং অপরিহার্য সরকারি ইপিআই টিকাদান সেবা নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রদান করে আসছে।


