ডলারের দরে অনানুষ্ঠানিক সীমা বেঁধে দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

Table of content

Table of content

সংবাদ সারাদিন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২৬

আন্তব্যাংক ও রেমিট্যান্স বাজার থেকে ১২৩ টাকা ৮২ পয়সার বেশি দরে ডলার না কেনার মৌখিক নির্দেশনা; বাজারভিত্তিক বিনিময় ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ব্যাংকারদের

দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের চাহিদা ও দাম বাড়তে থাকায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নতুন মৌখিক নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আন্তব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ও রেমিট্যান্স চ্যানেল থেকে প্রতি মার্কিন ডলার সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা দরে কিনতে বলা হয়েছে। এর বেশি দামে ডলার না কেনার এই নির্দেশনাকে বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা একটি “অনানুষ্ঠানিক সীমা” হিসেবে দেখছেন।

তবে এই নির্দেশনার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত কোনো লিখিত সার্কুলারের তথ্য পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে তাদের মৌখিকভাবে ডলার কেনার সর্বোচ্চ দর অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। ফলে সংবাদটি প্রকাশের ক্ষেত্রে এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত নির্ধারিত দর না বলে মৌখিক বা অনানুষ্ঠানিক নির্দেশনা হিসেবে উল্লেখ করাই যথাযথ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে ডলারের দর কত

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৯ জুলাই প্রকাশিত তথ্যে আন্তব্যাংক বাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের সর্বনিম্ন বা বিড দর দেখানো হয়েছে ১২৩ টাকা ৮০ পয়সা এবং সর্বোচ্চ বা আস্ক দর ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা। এদিন ডলারের ভারিত গড় বিনিময় হার ছিল ১২৩ টাকা ৮১ দশমিক ৯৮ পয়সা। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোকে দেওয়া কথিত মৌখিক সীমাটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত আন্তব্যাংক বাজারের সর্বোচ্চ দরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের স্পট রেফারেন্স রেটের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ জুলাই সকাল ১১টা পর্যন্ত ডলারের লেনদেনভিত্তিক গড় দর ছিল ১২৩ টাকা ৮৪ দশমিক ৯৩ পয়সা। দিন শেষে তা কিছুটা কমে ১২৩ টাকা ৭৯ দশমিক ৬১ পয়সায় দাঁড়ায়। জুনের শেষ থেকে জুলাইয়ের শেষভাগ পর্যন্ত ডলারের রেফারেন্স রেটে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।

ব্যাংকগুলোর ডলার সংগ্রহে সমস্যা

ব্যাংকারদের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের দর ১২৩ টাকা ৮২ পয়সার কাছাকাছি থাকলেও রেমিট্যান্স সংগ্রহের ক্ষেত্রে অনেক ব্যাংককে প্রতি ডলারের জন্য ১২৩ টাকা ৯০ পয়সা থেকে ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশিত সীমার মধ্যে থেকে প্রয়োজনীয় ডলার সংগ্রহ করা অনেক ব্যাংকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

কিছু ব্যাংক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নির্ধারিত সীমার কারণে অনেক ব্যাংক আন্তব্যাংক বাজারে ডলার বিক্রি করতে আগ্রহী হচ্ছে না। কারণ, বাজারে যে দামে তারা রেমিট্যান্স বা অন্যান্য উৎস থেকে ডলার সংগ্রহ করছে, তার চেয়ে কম দামে আন্তব্যাংক বাজারে বিক্রি করলে লোকসানের আশঙ্কা থাকে। এতে ব্যাংকগুলোর মধ্যে ডলারের স্বাভাবিক লেনদেন এবং বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে তাদের ধারণা।

কেন বাড়ছে ডলারের চাহিদা

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সরকারি বিভিন্ন আমদানির ঋণপত্র বা এলসি পরিশোধের চাপ বেড়ে যাওয়ায় ডলারের চাহিদা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি, সার ও অন্যান্য জরুরি পণ্য আমদানির বিল পরিশোধ এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের কারণে ব্যাংকিং খাতে ডলারের প্রয়োজন বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনৈতিক সূচকের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে আমদানি ঋণপত্রের মাধ্যমে প্রায় ৭০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৭০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ আমদানি পরিশোধে সামান্য প্রবৃদ্ধি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি ও বেসরকারি খাতের একসঙ্গে ডলার প্রয়োজন হওয়ায় বাজারে চাপ বেড়েছে।

কমেছে রেমিট্যান্সের প্রবাহ

ডলারের চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি রেমিট্যান্সের প্রবাহও আগের মাসের তুলনায় কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে প্রবাসীরা দেশে প্রায় ২৮১ কোটি ৭০ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন। এই পরিমাণ মে মাসের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ কম। ঈদ-পরবর্তী সময়ে রেমিট্যান্স কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর হাতে নতুন ডলারের সরবরাহও কিছুটা কমেছে।

ব্যাংকারদের মতে, বর্তমানে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যে পরিমাণ ডলার আসছে, আমদানি ও অন্যান্য বৈদেশিক দায় পরিশোধে তার চেয়ে বেশি ডলার বেরিয়ে যাচ্ছে। চাহিদা ও সরবরাহের এই ব্যবধানই ডলারের বিনিময় হারে চাপ সৃষ্টি করছে।

ডলার কেনা বন্ধ রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

এর আগে বাজারে ডলারের সরবরাহ বেশি থাকার সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে নিলামের মাধ্যমে ডলার কিনেছিল। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে প্রায় ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার কেনে। তবে টাকার ওপর অবমূল্যায়নের চাপ তৈরি হওয়ার পর গত দেড় মাস ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনা বন্ধ রেখেছে। সর্বশেষ ৪ জুন ডলার কেনা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসিক হিসাবে জুন শেষে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার।

বাজারভিত্তিক বিনিময় ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না

গত ১৯ মে ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ডলারের বিনিময় হার বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। একই সঙ্গে বাজারে কারসাজি না করার জন্য ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করা হয়েছিল। নতুন করে মৌখিক সীমা দেওয়ার খবরের পর বাজারভিত্তিক বিনিময় হার বাস্তবায়ন নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল—আইএমএফও বাংলাদেশকে বিনিময় হারে অধিক নমনীয়তা বজায় রাখার পরামর্শ দিয়ে আসছে। ১২ থেকে ১৬ জুলাই ঢাকা সফরের পর আইএমএফের প্রতিনিধিদল জানায়, ২০২৫ সালে চালু করা ক্রলিং পেগ ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করলে বিনিময় হারে নমনীয়তা বাড়বে এবং দেশের বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা সহজ হবে।

আইএমএফের সর্বশেষ মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোকে স্বাধীনভাবে ডলারের দর নির্ধারণ করতে দেওয়ার পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনানুষ্ঠানিক হস্তক্ষেপের কারণে বাজারের মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

এর আগে সীমা ছিল ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা

গত এপ্রিলে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান থেকে রেমিট্যান্সের ডলার সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা দরে কিনতে মৌখিক নির্দেশনা দিয়েছিল। এর আগে ১৩ এপ্রিল সর্বোচ্চ দর ছিল ১২২ টাকা ৯০ পয়সা। বর্তমান সীমা ১২৩ টাকা ৮২ পয়সায় ওঠায় বোঝা যাচ্ছে, তিন মাসের ব্যবধানে বাজারে ডলারের চাহিদা ও বিনিময় হার দুটিই বেড়েছে।

সাধারণ মানুষের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে

ডলারের দর নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হলে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং অন্যান্য আমদানির ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে। কারণ ডলারের দাম বাড়লে আমদানিকারকদের একই পরিমাণ পণ্য কিনতে বেশি টাকা ব্যয় করতে হয়, যা পরে বাজারে পণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

তবে ব্যাংকগুলো যদি নির্ধারিত সীমার মধ্যে পর্যাপ্ত ডলার সংগ্রহ করতে না পারে, তাহলে আমদানি ঋণপত্র নিষ্পত্তিতে দেরি, আন্তব্যাংক লেনদেন কমে যাওয়া এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের সঙ্গে খোলাবাজারের ডলারের দামের ব্যবধান বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ মেয়াদে ডলারের প্রকৃত চাহিদা ও সরবরাহ অনুযায়ী স্বচ্ছভাবে দর নির্ধারণ না হলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।

সামনে কী হতে পারে

ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে কি না, তা মূলত রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়, আমদানি বিল পরিশোধের চাপ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে। ব্যাংকগুলো এখন ১২৩ টাকা ৮২ পয়সার মৌখিক সীমা কতটা অনুসরণ করে এবং আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ে কি না, সেটিই আগামী দিনের বাজার পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ছবির ক্যাপশন: ডলারের চাহিদা ও বিনিময় হারের ঊর্ধ্বমুখী চাপের মধ্যে ব্যাংকগুলোকে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা দরে ডলার কেনার মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *