সংবাদ সারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশি গ্রাহকদের লক্ষ্য করে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন প্রচার কিংবা অনলাইনে পণ্য ও সেবা বিক্রি করতে বিদেশি ডিজিটাল প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থানীয় নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ‘ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া প্রকাশ করেছে।
প্রস্তাবিত নীতিমালা কার্যকর হলে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা, গুগল, ইউটিউব, টিকটকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন প্রচার বা অনলাইন ব্যবসা পরিচালনার আগে সরকারের ডিজিটাল বিজনেস আইডেনটিটি—ডিবিআইডি নিবন্ধন নিতে হবে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশের প্রচলিত ভ্যাট, আয়কর এবং অন্যান্য প্রযোজ্য আইন মেনে চলতে হবে।
এখনো চূড়ান্ত হয়নি নীতিমালা
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ২২ জুলাই ২০২৬ খসড়া নীতিমালাটি প্রকাশ করেছে। এটি এখনো চূড়ান্ত বা কার্যকর কোনো আইন নয়। খসড়াটির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মতামত ৬ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত গ্রহণ করা হবে। মতামত পর্যালোচনার পর প্রয়োজনীয় সংশোধন করে নীতিমালাটি চূড়ান্ত করার পরবর্তী প্রক্রিয়া শুরু হবে।
ফলে বর্তমানে কেউ ফেসবুক বা গুগলে বিজ্ঞাপন দিলে নতুন এই নীতিমালার অধীনে তাৎক্ষণিকভাবে আলাদা কোনো নিবন্ধন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়নি। খসড়াটি অনুমোদিত ও কার্যকর হওয়ার পর এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং কার ওপর কোন শর্ত প্রযোজ্য হবে, তা আরও স্পষ্ট হবে।
বিদেশি প্ল্যাটফর্মকে নিতে হবে ডিবিআইডি
খসড়া অনুযায়ী, বিদেশ থেকে বাংলাদেশে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, পণ্য অথবা সেবা বিক্রি করতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিজিটাল বিজনেস আইডেনটিটি বা ডিবিআইডি নিবন্ধন নিতে হবে।
ডিবিআইডি হলো ব্যবসাকে ডিজিটালভাবে স্বতন্ত্র পরিচয়ে নিবন্ধিত করার একটি সরকারি ব্যবস্থা। এর উদ্দেশ্য ডিজিটাল ব্যবসাগুলোকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা এবং তাদের পরিচয়, কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি করা।
প্রস্তাবিত নীতিমালায় বিদেশি প্ল্যাটফর্মের শুধু ভ্যাট নিবন্ধন থাকলেই যথেষ্ট হবে কি না, নাকি তাদের বাংলাদেশে আলাদা আইনগত বা প্রতিনিধিত্বমূলক উপস্থিতি রাখতে হবে—এ বিষয়টি বাস্তবায়ন বিধিমালায় আরও পরিষ্কার করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে খসড়ায় স্থানীয় নিবন্ধিত উপস্থিতি এবং ডিবিআইডি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভ্যাট ও কর আদায় নিশ্চিত করাই অন্যতম লক্ষ্য
দেশীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপন প্রচার করছে। কিন্তু সীমান্ত পেরিয়ে পরিচালিত এসব ডিজিটাল লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, মূল্য নির্ধারণ এবং কর তদারকির জন্য সমন্বিত কাঠামোর ঘাটতি রয়েছে।
খসড়া নীতিমালার মাধ্যমে বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলোকে দেশের প্রচলিত ভ্যাট, আয়কর ও অন্যান্য আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতার আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের অর্থপ্রবাহকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় আনা, রাজস্ব ফাঁকি কমানো এবং সীমান্তপারের ডিজিটাল লেনদেনের স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করা।
বিভ্রান্তিকর ও অবৈধ বিজ্ঞাপনে নিষেধাজ্ঞা
প্রস্তাবিত নীতিমালায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে কেবল বৈধ পণ্য ও সেবার বিজ্ঞাপন প্রচারের অনুমতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
নকল, ভেজাল, নিষিদ্ধ বা গ্রাহককে বিভ্রান্ত করতে পারে—এমন পণ্য ও সেবার বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে না। অনলাইন জুয়া, বেটিং, অননুমোদিত লটারি এবং বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি আইনে নিষিদ্ধ পণ্য ও সেবার ডিজিটাল প্রচার ও বাণিজ্য বন্ধের প্রস্তাবও রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া অর্থের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়—এমন অননুমোদিত গিফট কার্ড, ভাউচার বা ডিজিটাল উপকরণ ইস্যু, বিক্রি কিংবা বিনিময় করার ওপরও নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ভোক্তা সুরক্ষায় ফেরত ও রিফান্ডের বিধান
আন্তর্জাতিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে পণ্য কেনার পর নকল, ত্রুটিপূর্ণ, মেয়াদোত্তীর্ণ বা ঘোষিত মানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পণ্য পাওয়া গেলে বিক্রেতাকে তা ফেরত নিতে হবে। একই সঙ্গে গ্রাহক যে মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করেছেন, সেই মাধ্যমেই সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
বিক্রেতাদের বিক্রয়োত্তর সেবা, ওয়ারেন্টি, গ্যারান্টি, পণ্য ফেরত এবং রিফান্ডের শর্ত পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করতে হবে। সীমান্তপারের ডিজিটাল লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবও করা হয়েছে।
চালু হতে পারে ক্রস-বর্ডার এসক্রো
আন্তর্জাতিক অনলাইন কেনাকাটায় ক্রেতা ও বিক্রেতার আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে একটি ক্রস-বর্ডার এসক্রো সেবা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এই ব্যবস্থায় বিদেশি বিক্রেতাকে সরাসরি অর্থ না দিয়ে নির্দিষ্ট এসক্রো ব্যবস্থায় অর্থ রাখা হবে। পণ্য সফলভাবে সরবরাহ এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণ হওয়ার পর বিক্রেতাকে অর্থ ছাড় করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে পণ্য না পাওয়া, ভুল পণ্য পাওয়া অথবা প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকি কমতে পারে।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের রপ্তানিতে সহায়তার প্রস্তাব
নীতিমালাটি শুধু বিদেশি প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক ডিজিটাল বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতেও একাধিক উদ্যোগের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
ছোট পার্সেলে পণ্য রপ্তানির জন্য নীতিগত সহায়তা, বীমা সুবিধা, বিদেশি বাজার সম্পর্কে তথ্য, ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে উদ্যোক্তাদের সহায়তার কথা বলা হয়েছে। ডিজিটাল বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত রপ্তানি আয়কে প্রচলিত রপ্তানি আয়ের মতো বিবেচনা করে বিদ্যমান আর্থিক প্রণোদনার আওতায় আনার প্রস্তাবও রয়েছে।
এ ছাড়া দেশে ও বিদেশে প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, গুদাম, ড্রপ শিপিং, এন্ট্রেপো ও মার্চেন্টিং বাণিজ্যে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য নীতিগত সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা উল্লেখ করা হয়েছে।
বাস্তবায়ন তদারকিতে উচ্চপর্যায়ের কমিটি
খসড়া নীতিমালা বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে।
এই কমিটিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের রাখার কথা বলা হয়েছে।
বিজ্ঞাপনদাতা ও ডিজিটাল মার্কেটারদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
নীতিমালাটি কার্যকর হলে বিদেশি প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ভ্যাট, চালান, লেনদেনের হিসাব এবং বিজ্ঞাপনের বৈধতা যাচাইয়ে আরও কঠোরতা আসতে পারে। বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুমোদিত ও নিবন্ধিত প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার এবং সঠিক আর্থিক নথি সংরক্ষণে বেশি গুরুত্ব দিতে হতে পারে।
তবে ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ, স্থানীয় ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সি অথবা প্রত্যেক বিজ্ঞাপনদাতাকে নতুন করে ডিবিআইডি নিতে হবে—খসড়া প্রকাশের তথ্য থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। মূল নিবন্ধন প্রস্তাবটি বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সীমান্তপারের ডিজিটাল বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের জন্য। চূড়ান্ত নীতিমালা ও বাস্তবায়ন নির্দেশিকা প্রকাশের পর স্থানীয় বিজ্ঞাপনদাতা ও এজেন্সিগুলোর দায়িত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নীতিমালা প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও দূর থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করা আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবন্ধন ও কর পরিশোধে বাধ্য করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিটিআরসি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন হবে।
ছবির ক্যাপশন: বাংলাদেশে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ও অনলাইন ব্যবসা পরিচালনাকারী বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে খসড়া নীতিমালা প্রকাশ করেছে সরকার। ছবি: সংগৃহীত
সংক্ষিপ্ত বিবরণ: ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব ও টিকটকের মতো বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন প্রচার ও অনলাইন ব্যবসা পরিচালনার আগে ডিবিআইডি নিবন্ধনের আওতায় আনার প্রস্তাব করেছে সরকার। খসড়া নীতিমালায় ভ্যাট-কর পরিশোধ, ভোক্তা সুরক্ষা, নিষিদ্ধ বিজ্ঞাপন বন্ধ এবং নিরাপদ এসক্রো পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর কথাও বলা হয়েছে।


