হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৫ শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ৮৫৪

Table of content

Table of content

সংবাদ সারাদিন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৫ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৫ আগস্ট ২০২৬

দেশে চলমান হাম পরিস্থিতিতে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার, ৫ আগস্ট সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ের তথ্য নিয়ে প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হামবিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, সর্বশেষ মারা যাওয়া পাঁচ শিশুই ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা। তাদের মৃত্যু সন্দেহভাজন হামজনিত হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এই ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম আক্রান্ত হয়ে নতুন কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশে হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৫৪। এর মধ্যে ৭৫৮টি মৃত্যু সন্দেহভাজন হামজনিত এবং ৯৬টি মৃত্যু পরীক্ষাগারের পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হাম আক্রান্ত রোগীর। ফলে মোট প্রাণহানির সংখ্যা উল্লেখ করার সময় নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মৃত্যুর পার্থক্যটি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

একই সময়ে দেশে নতুন করে ৯৫৯ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী নথিভুক্ত হয়েছে। এতে গত ১৫ মার্চ থেকে সারা দেশে সন্দেহভাজন রোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ৯০৫ জনে।

অন্যদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষাগারে আরও ১২৪ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে দেশে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া মোট হাম রোগীর সংখ্যা বেড়ে ১৬ হাজার ৬৫৫ জনে পৌঁছেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন হাম নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১ লাখ ১৫ হাজারের বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১ লাখ ১১ হাজার ৫ জন চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছেড়েছেন। তবে প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদনে মোট ভর্তির সংখ্যায় সামান্য পার্থক্য দেখা যাওয়ায় সুনির্দিষ্ট মোট সংখ্যা ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরবর্তী সংশোধিত তথ্য অনুসরণ করা প্রয়োজন।

দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সংক্রমণ

চলতি বছরের শুরু থেকে বাংলাদেশে হাম রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলেও মার্চের মাঝামাঝি থেকে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত ২৩ এপ্রিল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, তখন দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে অন্তত ৫৮ জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়েছিল। আক্রান্তদের বড় অংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

সংক্রমণের বিস্তার, টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি এবং শিশুমৃত্যুর ঘটনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ের হাম পরিস্থিতিকে ‘উচ্চ ঝুঁকি’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছিল।

কেন শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে

হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস, কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে দৃশ্যমান ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার আগেও অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, টিকা না নেওয়া বা প্রয়োজনীয় দুই ডোজ টিকা সম্পন্ন না করা শিশুদের গুরুতর অসুস্থতা ও জটিলতার ঝুঁকি বেশি। হাম থেকে নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা, চোখের সমস্যা এবং অন্যান্য গুরুতর জটিলতা তৈরি হতে পারে।

যেসব উপসর্গে সতর্ক হতে হবে

হামের প্রাথমিক উপসর্গের মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল ও পানিযুক্ত হওয়া এবং মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ। পরবর্তী সময়ে সাধারণত মুখ ও ঘাড় থেকে লাল ফুসকুড়ি শুরু হয়ে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে।

শিশুর মধ্যে এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ। চিকিৎসকের পরীক্ষা না হওয়া পর্যন্ত অসুস্থ শিশুকে অন্য শিশু ও সুস্থ পরিবারের সদস্যদের থেকে আলাদা রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

টিকাই প্রধান সুরক্ষা

হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে নির্ধারিত সময়ে টিকা গ্রহণ। বাংলাদেশের নিয়মিত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে সাধারণভাবে নয় মাস বয়সে প্রথম এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় হাম-রুবেলা টিকার ডোজ দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, একটি ডোজ কিছুটা সুরক্ষা দিলেও প্রয়োজনীয় দুই ডোজ সম্পন্ন হলে সুরক্ষা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। হাম ছড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণ করতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুর দুই ডোজ টিকার আওতায় থাকা প্রয়োজন।

ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ ও শিশুমৃত্যুর পর সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং গ্যাভির সহযোগিতায় গত এপ্রিলে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম শুরু করে। পরে কার্যক্রম দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা হয়। এ কর্মসূচিতে বেশি ঝুঁকিতে থাকা ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামকে সাধারণ জ্বর বা ফুসকুড়ির রোগ হিসেবে অবহেলা না করে শিশুর মধ্যে উপসর্গ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিকটবর্তী হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হবে। পাশাপাশি শিশুর নিয়মিত টিকার ডোজ সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা টিকাকার্ড দেখে নিশ্চিত করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *