সংবাদ সারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৮ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২৮ জুলাই ২০২৬
উপশিরোনাম: যুক্তরাষ্ট্র–ইরান উত্তেজনা, হরমুজ ও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং তেল স্থাপনায় হামলার আশঙ্কায় অস্থির আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে। কখনো সংঘাত বৃদ্ধির খবরে দাম দ্রুত বাড়ছে, আবার যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতির আভাসে তা কমে যাচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না।
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৬ দশমিক ৬১ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট—ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম কমে প্রায় ৮১ দশমিক ৩৫ ডলারে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনার অগ্রগতি এবং হামলায় সাময়িক বিরতির খবরে বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা তৈরি হওয়ায় দাম কমেছে। তবে সামগ্রিক ঝুঁকি এখনো অনেক বেশি বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
কয়েক দিনের ব্যবধানেই বড় উত্থান-পতন
বিশ্ববাজারে তেলের দামের বর্তমান অস্থিরতা বোঝা যায় সাম্প্রতিক কয়েক দিনের লেনদেন থেকে। ২২ জুলাই মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এবং জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ব্রেন্টের দাম ৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৪ দশমিক ০৭ ডলারে পৌঁছেছিল। একই দিনে ডব্লিউটিআইয়ের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে ৮৬ দশমিক ৮৩ ডলারে দাঁড়ায়।
এরপর ২৪ জুলাই কূটনৈতিক উদ্যোগের সম্ভাবনার খবরে ব্রেন্টের দাম প্রায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ৯৬ দশমিক ৭৮ ডলারে এবং ডব্লিউটিআই ৩ দশমিক ১ শতাংশ কমে ৮৯ দশমিক ৩১ ডলারে নেমে আসে। যদিও আগের দিন ব্রেন্টের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়েছিল। এই ওঠানামা দেখাচ্ছে, তেলের বাজার এখন সরবরাহ ও চাহিদার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি রাজনৈতিক ও সামরিক খবরের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ
বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে জাহাজ চলাচল বন্ধ বা সীমিত হলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। ওমান ও ইরানকে যুক্ত করে জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনায় একটি আঞ্চলিক কাঠামো তৈরির আলোচনা বাজারে কিছুটা স্বস্তি দিলেও পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার জুলাই মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুনে হরমুজ দিয়ে কিছু তেল পরিবহন পুনরায় শুরু হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ প্রতিদিন ৪১ লাখ ব্যারেল বেড়ে ৯ কোটি ৮৮ লাখ ব্যারেলে পৌঁছায়। তারপরও উৎপাদন যুদ্ধের আগের মাত্রার তুলনায় প্রতিদিন প্রায় ৯৪ লাখ ব্যারেল কম ছিল। দ্রুত উত্তেজনা না কমলে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ গড়ে প্রতিদিন ৩৭ লাখ ব্যারেল কমতে পারে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
লোহিত সাগরেও বাড়ছে ঝুঁকি
হরমুজের পাশাপাশি লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়েও নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর হামলা ও অবরোধের হুমকির কারণে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে এশিয়ায় তেল পরিবহনের বিকল্প পথও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এতে জাহাজকে দীর্ঘ পথ ঘুরে চলতে হচ্ছে, পরিবহন সময় ও বিমা ব্যয় বাড়ছে।
সৌদি তেল অবকাঠামো এবং পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে হামলার দাবিও সরবরাহ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাতে সাময়িক বিরতি এবং মধ্যস্থতাকারীদের আলোচনায় অগ্রগতির খবর বাজারকে কিছুটা শান্ত করেছে, নতুন করে হামলা শুরু হলে তেলের দাম আবার দ্রুত বাড়তে পারে।
এশিয়ার দেশগুলোর ওপর বাড়তে পারে চাপ
মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল এশিয়ার দেশগুলো বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশ বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। কিন্তু দীর্ঘ পরিবহন পথ, উচ্চ বিমা প্রিমিয়াম এবং সীমিত বিকল্প সরবরাহের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশও আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতির দেশ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে জ্বালানি আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের ওপর প্রভাব পড়তে পারে—এটি আন্তর্জাতিক সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ভিত্তিতে করা একটি অর্থনৈতিক অনুমান। তবে দেশের বাজারে কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে সরকারি মূল্যনীতি, আমদানি চুক্তি, মুদ্রার বিনিময় হার এবং তেলের আন্তর্জাতিক দাম কতদিন উঁচু থাকে তার ওপর।
সামনে কোন দিকে যাবে তেলের দাম
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি শুরু হলে এবং যুক্তরাষ্ট্র–ইরান আলোচনায় অগ্রগতি হলে ব্রেন্টের দাম আরও কমতে পারে। বিপরীতে, আলোচনা ব্যর্থ হওয়া, তেল স্থাপনায় নতুন হামলা অথবা লোহিত সাগরের পরিবহন বাধা দীর্ঘায়িত হলে দাম আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।
সব মিলিয়ে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম আপাতত কিছুটা কমলেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো বাজারের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। কূটনৈতিক অগ্রগতি ও সংঘাতের খবরের ওপর ভিত্তি করে আগামী দিনগুলোতেও তেলের দামে বড় ধরনের উত্থান-পতন দেখা যেতে পারে।


