অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিল ‘অর্ণব’, বুধবার আঘাতের শঙ্কা; বাংলাদেশের ৪ বন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত

Table of content

Table of content

ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে ঘূর্ণিঝড়টি। সম্ভাব্য স্থলভাগ অতিক্রমের সময় বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

সংবাদ সারাদিন ডেস্ক | ঢাকা | ২৭ অক্টোবর ২০২৬

মধ্য বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ আরও শক্তি সঞ্চয় করে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে। ক্রমেই ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে শক্তিশালী এই ঘূর্ণিঝড়। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালের দিকে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ ও ইয়ানাম উপকূল অতিক্রম করতে পারে এটি।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বঙ্গোপসাগর উত্তাল হয়ে ওঠায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত জারি করা হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের নির্দেশ দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের (IMD) হালনাগাদ বুলেটিনে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

কোথায় অবস্থান করছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’?

ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের মঙ্গলবার সকাল ১০টা ৮ মিনিটের (ভারতীয় সময়) বুলেটিন অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টি সকাল সাড়ে ৫টায় পশ্চিমমধ্য বঙ্গোপসাগরে ১৫ দশমিক ৯ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৪ দশমিক ৮ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থান করছিল।

ওই সময় ঘূর্ণিঝড়টি ভারতের বিশাখাপত্তনম থেকে প্রায় ২৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে, কাকিনাড়া থেকে ৩০০ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্বে এবং ওড়িশার গোপালপুর থেকে প্রায় ৩৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল।

গত ছয় ঘণ্টায় ঘূর্ণিঝড়টি ঘণ্টায় প্রায় ২২ কিলোমিটার বেগে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়েছে।

আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়টি পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে। এরপর উত্তর-পশ্চিম দিকে বাঁক নিয়ে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কখন এবং কোথায় আঘাত হানতে পারে?

ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামীকাল বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালের দিকে অন্ধ্রপ্রদেশের বাপটলা থেকে বিশাখাপত্তনমের মধ্যবর্তী উপকূল দিয়ে স্থলভাগ অতিক্রম করতে পারে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’।

বিশেষ করে ইয়ানামের কাছাকাছি এলাকা দিয়ে ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্র স্থলভাগে প্রবেশ করার সম্ভাবনা রয়েছে।

স্থলভাগ অতিক্রমের সময় ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্রের আশপাশে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৫ থেকে ১২৫ কিলোমিটার থাকতে পারে। দমকা বা ঝোড়ো হাওয়ার বেগ বেড়ে ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।

তবে আবহাওয়ার পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির কারণে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ, শক্তি এবং স্থলভাগ অতিক্রমের সম্ভাব্য সময়ে পরিবর্তন আসতে পারে।

বাংলাদেশের চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতের বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ২ নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত নামিয়ে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়।

ওই বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় প্রবল ঘূর্ণিঝড়টি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে প্রায় ৮৭০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার থেকে ৮১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা থেকে ৭৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল।

তখন ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্রের ৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৮৯ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ১১৭ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল।

ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকায় সাগর বিক্ষুব্ধ থাকায় সব ধরনের নৌযানকে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে কতটা প্রভাব পড়তে পারে?

ঘূর্ণিঝড়টির সম্ভাব্য গতিপথ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলমুখী হওয়ায় বাংলাদেশে সরাসরি আঘাত হানার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।

তবে এর প্রভাবে দেশের উপকূলীয় এলাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মেঘের পরিমাণ বৃদ্ধি, দমকা হাওয়া এবং বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মঙ্গলবার খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু এলাকায় এবং ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের দু-এক জায়গায় বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।

বুধবার বরিশাল, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগের অনেক জায়গায় বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের অন্য বিভাগগুলোর কিছু এলাকাতেও বৃষ্টি হতে পারে।

তবে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও বিস্তার ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ এবং আবহাওয়ার অন্যান্য অবস্থার ওপর নির্ভর করবে।

ভারতের উপকূলে ব্যাপক প্রস্তুতি, সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বাসিন্দাদের

ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর সম্ভাব্য আঘাত মোকাবিলায় ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশা রাজ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের মঙ্গলবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার রাত পর্যন্ত অন্ধ্রপ্রদেশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

রাজ্যটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, প্রায় চার লাখ মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। সেই লক্ষ্যে উদ্ধার ও আশ্রয় কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

অন্যদিকে, ওড়িশার পাঁচটি জেলায় মঙ্গলবার ও বুধবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ভারতের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলীয় রেল যোগাযোগেও বিঘ্ন ঘটেছে। অন্তত ১২টি ট্রেন বাতিল এবং দক্ষিণ উপকূলের ৫৩টি রুটে নির্ধারিত সময়ের জন্য রেলসেবা স্থগিত করার খবর পাওয়া গেছে।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দুর্যোগ মোকাবিলায় জাতীয় ও রাজ্য পর্যায়ের উদ্ধারকারী বাহিনীকে প্রস্তুত রেখেছে।

উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা

ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টি স্থলভাগ অতিক্রমের সময় অন্ধ্রপ্রদেশের নিচু উপকূলীয় এলাকায় স্বাভাবিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক জোয়ারের উচ্চতার চেয়ে অতিরিক্ত ১ থেকে ২ মিটার জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি করতে পারে।

বিশেষ করে কাকিনাড়া ও ইয়ানামসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকাগুলো বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে।

ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত, ঝোড়ো বাতাস এবং জলোচ্ছ্বাসের কারণে উপকূলীয় বসতি, কৃষিজমি, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে এই জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের জন্য; এটি বাংলাদেশের উপকূলের সম্ভাব্য জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা নির্দেশ করে না।

‘অর্ণব’ নামটি দিয়েছে বাংলাদেশ

ঘূর্ণিঝড়টির নাম ‘অর্ণব’ প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ। বাংলা ভাষায় অর্ণব শব্দের অর্থ সমুদ্র বা সাগর।

বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরের ঘূর্ণিঝড়গুলোর নাম নির্ধারণ করা হয় আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রস্তাবিত নামের তালিকা অনুসারে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (WMO) ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অংশগ্রহণে এই নামকরণ প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়।

নির্দিষ্ট নামে ঘূর্ণিঝড় শনাক্ত করা হলে আবহাওয়ার সতর্কবার্তা প্রচার, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম

পরিচালনা সহজ হয়।

উপকূলবাসীর জন্য সতর্কতা

ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ সরাসরি বাংলাদেশে আঘাত হানার সম্ভাবনা কম হলেও সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানরত মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষ করে জেলে, মাছ ধরার ট্রলারচালক এবং সমুদ্রগামী নৌযান পরিচালনাকারীদের আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।

পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলা, অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিপূর্ণ নৌযাত্রা এড়ানো এবং নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে আবহাওয়ার খবর জানার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

ঘূর্ণিঝড়ের অবস্থান ও শক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। তাই পরবর্তী আবহাওয়া বুলেটিনগুলো বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করা জরুরি।

সংবাদ সারাদিন | জাতীয় সংবাদ | আবহাওয়া ও দুর্যোগ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *