ঢাকা, ১২ অক্টোবর ২০২৬: মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ, দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং টাকার বিনিময়মূল্য নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশের মুদ্রানীতি পরিচালনায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। তাঁর মতে, সুদের হার কমিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোর চেষ্টা যেমন মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তেমনি দীর্ঘ সময় উচ্চ সুদের হার বজায় রাখলে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে ৭ অক্টোবর প্রকাশিত Holding the line: Monetary policy under asymmetric uncertainty শীর্ষক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে তিনি বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন ঝুঁকি তুলে ধরে মুদ্রানীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণে সতর্কতা, নিয়মিত পর্যালোচনা এবং নীতিগত সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
নীতিসুদ ৯.৫ শতাংশে রাখার প্রেক্ষাপট
নিবন্ধ অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক তার প্রথম ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি বিবৃতিতে নীতিসুদ ৯.৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল থাকা এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি আবার বাড়তে পারে—এমন পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য রয়েছে।
জাহিদ হোসেনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শুধু সুদের হার পরিবর্তন করে অর্থনীতির সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সরকারি ব্যয়, জ্বালানির মূল্য, বৈদেশিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ব্যাংকিং খাতের আর্থিক সক্ষমতাও মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির ওপর প্রভাব ফেলে।
জ্বালানির মূল্য ও বেতন কাঠামো থেকে মূল্যস্ফীতির চাপ
নিবন্ধে বাংলাদেশের ২০১০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মাসিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক তথ্য বিশ্লেষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখক দেখিয়েছেন, বিদ্যুৎ ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিতে ভিন্ন ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিদ্যুতের শুল্ক ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে পরবর্তী দুই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতির বৃদ্ধির হারে প্রায় ২ শতাংশ পয়েন্টের অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, ডিজেলের প্রায় ১৭ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি মূলত মূল্য সমন্বয়ের সময়ের কাছাকাছি অখাদ্য মূল্যস্ফীতিতে প্রায় ১ শতাংশ পয়েন্টের অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে এগুলো অতীতের তথ্যের ভিত্তিতে করা সম্ভাব্য প্রভাবের হিসাব—বাস্তবে মূল্যস্ফীতি ঠিক এই পরিমাণ বাড়বে, এমন নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।
প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত নিয়মিত সরকারি ব্যয় হতে পারে বলেও নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকের মতে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি একদিকে বাজারে চাহিদা বাড়াতে পারে, অন্যদিকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়াতে পারে। এই দুই চাপ একসঙ্গে কাজ করলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সুদের হার কমালেই কি বাড়বে বিনিয়োগ?
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে সুদের হার কমানোর পক্ষে যুক্তি থাকলেও, এর সুফল কতটা কার্যকরভাবে বিনিয়োগ ও উৎপাদনে পৌঁছাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাহিদ হোসেন।
তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নীতিসুদের পরিবর্তনের প্রভাব ব্যাংকের ঋণের সুদে তুলনামূলক দ্রুত দেখা গেলেও ঋণপ্রবাহ এবং উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সেই সম্পর্ক ততটা শক্তিশালী নয়। ঋণ বিতরণে দুর্বলতা, অনিশ্চয়তা এবং অর্থায়নের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে কম সুদও নতুন বিনিয়োগ বাড়ানোর নিশ্চয়তা দেয় না।
অন্যদিকে, সুদের হার কমানোর ফলে ঋণ ও ব্যয় দ্রুত বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদাও বাড়তে পারে। এতে টাকার বিনিময়মূল্যের ওপর চাপ সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
দীর্ঘ সময় উচ্চ সুদ রাখারও ঝুঁকি রয়েছে
সুদের হার বেশি রাখলে মূল্যস্ফীতির দ্বিতীয় পর্যায়ের চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং মুদ্রার স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহায়তা মিলতে পারে। কিন্তু খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির মতো সরবরাহজনিত কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়লে শুধু উচ্চ সুদের হার দিয়ে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।
এ ছাড়া ঋণের ব্যয় বাড়লে ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে নীতিনির্ধারকদের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো—কোন সিদ্ধান্তে সম্ভাব্য ক্ষতি বেশি এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে কোন ঝুঁকি বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত, তা নির্ধারণ করা।
জাহিদ হোসেনের যুক্তি, খুব দ্রুত সুদের হার কমিয়ে দিলে মূল্যস্ফীতি ও বিনিময়মূল্যের ওপর চাপ বাড়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে দ্রুত দেখা দিতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় উচ্চ সুদ বজায় রাখলে প্রবৃদ্ধির কী পরিমাণ ক্ষতি হবে, তা নির্ধারণ করাও সহজ নয়। এই অসম অনিশ্চয়তার কারণেই তিনি আপাতত সতর্ক অবস্থানের পক্ষে মত দিয়েছেন।
সমন্বিত নীতির ওপর গুরুত্ব
নিবন্ধে মুদ্রানীতির পাশাপাশি আরও কয়েকটি ক্ষেত্রে সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিনিময় হারকে অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে কার্যকরভাবে ভূমিকা রাখতে দেওয়া, ব্যাংকিং খাতের আর্থিক সক্ষমতা ও ঋণশৃঙ্খলা জোরদার করা এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন নিশ্চিত করা।
লেখকের মতে, পুনঃঅর্থায়ন বা বিশেষ ঋণসুবিধার সাফল্য শুধু কত টাকা বিতরণ করা হলো, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং সেই অর্থ নতুন উৎপাদন, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কতটা বাড়াতে পারছে, সেটিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি পর্যালোচনার নতুন কাঠামো নিয়মিতভাবে ঝুঁকি পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ে পর্যালোচনা, সিদ্ধান্তের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে নীতির সামঞ্জস্য রাখার ওপর।
সব মিলিয়ে, জাহিদ হোসেনের বিশ্লেষণের মূল বার্তা হলো—বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করতে হলে শুধু সুদের হার পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বরং মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতি, ঋণপ্রবাহ, বিনিময় হার এবং ব্যাংকিং খাতের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সতর্ক ও সমন্বিত নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।


