প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষা, জাটকা নিধন বন্ধ, নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার ও কঠোর আইন প্রয়োগে জোর; গত অর্থবছরে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৫.৫ শতাংশ।
বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নতুন প্রকল্প, কঠোর নজরদারি, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণে আইন প্রয়োগ জোরদার, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং গবেষণা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময় ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের সহায়তা দিতে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতাও বাড়ানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) বরাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইলিশের উৎপাদন বছরে বছরে ওঠানামা করতে পারে। তাই সাম্প্রতিক উৎপাদন হ্রাসকে উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নতুন প্রকল্পে সংরক্ষণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানে গুরুত্ব
মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা শাখার উপপরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ বাসসকে জানান, আগের ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এর পর নতুন একটি প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে, যা অনুমোদনের পর শুরু হবে।
‘মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণের মাধ্যমে ইলিশের টেকসই উন্নয়ন’ শীর্ষক নতুন প্রকল্পে আইন প্রয়োগ, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের খাদ্যসহায়তা দিতে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা ৬ লাখ ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৬ লাখ ৪৬ হাজার করা হয়েছে। অর্থাৎ, নতুন করে আরও ২৬ হাজার জেলেকে এ সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে।
এক বছরে ইলিশ উৎপাদন কমেছে প্রায় ৫.৫ শতাংশ
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল ৫ লাখ ২৯ হাজার টন। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা কমে প্রায় ৫ লাখ টনে দাঁড়ায়। অর্থাৎ, এক অর্থবছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে আনুমানিক ৫.৫ শতাংশ।
দেশের মোট মাছ উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ১২ শতাংশ। ফলে ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়া শুধু খাদ্য সরবরাহ নয়, মৎস্য অর্থনীতি ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ উৎপাদন হ্রাসের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রতিবেশব্যবস্থার পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক ধারাবাহিকতার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলোর ফলে আগামী বছরগুলোতে উৎপাদন বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে জোর
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু বাসসকে বলেছেন, ইলিশ রক্ষা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এ ক্ষেত্রে সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে কার্যকরের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। এ সময় ইলিশ আহরণ বন্ধ রাখা হলে মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তারে সহায়তা পাওয়া যাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে জেলেদেরও উপকার হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নির্দিষ্ট সময়ে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করলেই হবে না; নিষেধাজ্ঞার বাইরেও নিয়মিত নজরদারি, মা ইলিশের সুরক্ষা এবং নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
উৎপাদন হ্রাসের পেছনে একাধিক কারণ
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশিং অ্যান্ড পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মাসুদ রানা বলেন, ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার জন্য কোনো একটি কারণকে এককভাবে দায়ী করা যায় না।
তাঁর উল্লেখ করা প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ আহরণ এবং নির্বিচারে জাটকা নিধন।
- ছোট ফাঁসের জাল ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার।
- নদীর নাব্যতা হ্রাস ও পানিদূষণ।
- অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন।
- সমুদ্রে অতিরিক্ত মাছ আহরণ এবং নির্ধারিত এলাকার বাইরে ট্রলার পরিচালনার অভিযোগ।
বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মো. আবদুল ওয়াহাবও মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণকে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ এবং ইলিশের অভয়াশ্রমগুলোর সীমানা পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার।
ইলিশ সংরক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের প্রস্তাব
ইলিশের চলাচলের পথ, প্রজননক্ষেত্র এবং মজুত নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাঁদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে স্যাটেলাইট ও ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা (জিআইএস), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মেশিন লার্নিং, পানির গুণমান পর্যবেক্ষণে আইওটি সেন্সর, ড্রোন এবং জাহাজের অবস্থান শনাক্তে জিপিএসভিত্তিক নজরদারি। এসব প্রযুক্তি সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা গেলে অবৈধ মাছ আহরণ শনাক্ত, ইলিশের মজুত মূল্যায়ন এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।
এ ছাড়া পদ্মা, মেঘনা ও তেঁতুলিয়াসহ প্রধান নদী অববাহিকার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ এবং মোহনাগুলোর পরিবেশ সংরক্ষণকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইলিশের খাদ্য ও নদীর পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ
প্রতিবেদনে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মেঘনা নদীতে ইলিশের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত প্ল্যাঙ্কটনের পরিমাণ ৬৮ শতাংশ কমেছে, যার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দূষণকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পদ্মা ও মেঘনা মোহনায়ও প্ল্যাঙ্কটনের পরিমাণ কমে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এ ধরনের পরিবর্তন ইলিশের বৃদ্ধি ও আকারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ইলিশ সংরক্ষণের উদ্যোগে মাছ ধরার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নদীর পানির গুণমান ও সামগ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থা রক্ষাও জরুরি।
ইলিশ বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উপকূলীয় মানুষের জীবিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৬ লাখ মানুষ সরাসরি ইলিশ আহরণের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া পরিবহন, বিপণন ও প্রক্রিয়াজাতকরণসহ সংশ্লিষ্ট কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন আরও ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) State of World Fisheries and Aquaculture 2024 প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে আহরণভিত্তিক মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়, জলজ চাষে পঞ্চম এবং ইলিশ উৎপাদনে প্রথম স্থানে রয়েছে। বাংলাদেশি ইলিশ ২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়।


