সংবাদ সারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
একসময় বাংলাদেশে ডেঙ্গুকে মূলত রাজধানী ঢাকার রোগ হিসেবে দেখা হলেও সেই পুরোনো ধারণা এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ডেঙ্গু এখন আর কেবল ঢাকার গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ক্রমান্বয়ে বিস্তৃত হচ্ছে জেলা শহর, উপজেলা, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রাম ও পাহাড়ি এলাকাতেও। সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৪৭৫ জনে এবং মৃতের সংখ্যা পৌছেছে ১৩০ জনে। তবে এই হিসাব কেবল সরকারি হাসপাতালভিত্তিক হওয়ায় বাস্তবে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বহু গুণ বেশি বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে ডেঙ্গু এখন আর সাধারণ নগরকেন্দ্রিক সমস্যা নয়, বরং পুরো দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক ও ক্রমবর্ধমান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর এই উদ্বেগজনক বিস্তারের পেছনে একাধিক পরিবেশগত ও সামাজিক কারণ কাজ করছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জেলা ও উপজেলা শহরের দ্রুত সম্প্রসারণ, অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা, নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমে থাকা এবং দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এডিস মশার প্রজননকে ত্বরান্বিত করছে। এর পাশাপাশি মানুষের ব্যাপক ও দ্রুত যাতায়াত ভাইরাস ছড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে। ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহর থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিরা যখন নিজ নিজ জেলা বা গ্রামে ফেরেন, তখন সেখানে থাকা স্থানীয় এডিস মশা তাদের কামড় দিয়ে ভাইরাস গ্রহণ করে এবং পরবর্তীতে সুস্থ মানুষকে কামড়ানোর মাধ্যমে জেলা পর্যায়ে নতুন সংক্রমণের চক্র তৈরি করে। খুলনা বিভাগের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এর বড় প্রমাণ; আগস্ট মাসে সেখানে রোগী ভর্তি তিন গুণ বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালে তীব্র শয্যাসংকট দেখা গেছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে কেবল পূর্ণবয়স্ক মশা নিধন বা ঢাকাকেন্দ্রিক অভিযানের প্রথাগত কৌশল আর কার্যকর হচ্ছে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা উত্তর সিটির যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশের বেশি এডিস মশা জন্মায় মানুষের বসতবাড়ির ভেতরের পাত্র, পানির ড্রাম, ট্যাংক ও বেইসমেন্টে জমানো পানিতে। ফলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও শুধু ড্রেন বা উন্মুক্ত স্থান পরিষ্কার করার বদলে বসতবাড়ির ভেতরের প্রজননস্থল ধ্বংসের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু রোগীর সংখ্যা দেখে ব্যবস্থা না নিয়ে প্রজননস্থলের ওপর ভিত্তি করে জেলাভিত্তিক ‘ঝুঁকি মানচিত্র’ ও আগেভাগে প্রতিরোধমূলক নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসকে সামনে রেখে খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, চট্টগ্রাম, গাজীপুরসহ সব ঝুঁকিপূর্ণ জেলা এবং পাহাড়ি এলাকায় এখনই সমন্বিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি ঢাকার বাইরের জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে দ্রুত ডেঙ্গু শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে ঢাকায় রোগী স্থানান্তরের চাপ কমানো যায়। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচীকে এখন রোগী বাড়ার পরের প্রতিক্রিয়াশীল পদক্ষেপ থেকে সরিয়ে ‘পূর্বাভাস ও আগাম প্রতিরোধমূলক’ কৌশলে সাজাতে হবে। স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও জনগণের যৌথ অংশগ্রহণে তথ্যনির্ভর জাতীয় কৌশল গ্রহণ করেই কেবল এই জাতীয় স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।


