লোডশেডিংয়ের জালে দেশ: বিদ্যুৎ খাতের নেপথ্যে ‘পঞ্চপাণ্ডব’ ও মেগা লুটপাট

সংবাদ সারাদিন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯   সেপ্টেম্বর | আপডেট: ০৯   সেপ্টেম্বর ২০২৬  

মৌসুমের তীব্র গরমে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন দেশের সাধারণ মানুষ। কাগজে-কলমে পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সংকট ও বিপুল বকেয়া ধারের কারণে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ তলানিতে ঠেকেছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে পরিকল্পিতভাবে লুটপাটের আখড়ায় পরিণত করা হয়েছিল। বিশেষ আইনি সুরক্ষা (দায়মুক্তি) এবং ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’-এর মতো ব্যবস্থার আড়ালে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের নেপথ্যে বিগত সরকারের আমলে গঠিত শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট বা ‘পঞ্চপাণ্ডব’-এর নাম উঠে এসেছে।

কাগজে উদ্বৃত্ত, বাস্তবে ঘাটতি:

উৎপাদন সক্ষমতা বনাম বাস্তব উৎপাদন: দেশে বিদ্যুতের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৯,০০০ মেগাওয়াট এবং সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮,৫০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি। অথচ গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের কারণে বাস্তবে মাত্র ১২,০০০ থেকে ১৪,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, ফলে দৈনিক ঘাটতি থাকছে ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ মেগাওয়াট।

বন্ধ বিদ্যুৎকেন্দ্র: দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৭১টিরও বেশি কেন্দ্র বর্তমানে হয় পুরোপুরি বন্ধ, নয়তো সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম শক্তিতে চলছে।

জ্বালানি সংকট ও বকেয়া পাওনা: গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালাতে প্রতিদিন ১,২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও পেট্রোবাংলা সরবরাহ করছে মাত্র ৮৫০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এছাড়া বেসরকারী বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর (IPPs) কাছে সরকারের প্রায় ১৬,৫০০ কোটি টাকারও বেশি বকেয়া পাওনা আটকে থাকায় অর্থসংকটে জ্বালানি তেল বা কয়লা আমদানি ব্যাহত হচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাত ধ্বংসের নেপথ্যে ‘পঞ্চপাণ্ডব’:

বিশ্লেষকদের মতে, গত ১৫ বছরে একটি নীতিগত ফাঁদ ও লুণ্ঠনের সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়েছিল। এই প্রক্রিয়ার মূল কারিগর হিসেবে পাঁচজনের নাম উঠে এসেছে:

১. ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী (সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা): আপদকালীন সমাধানের নামে আড়াই দশকের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে বেসরকারি খাতে অপ্রয়োজনীয় ও ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ প্রকল্পের সূচনা করেন।

২. আবুল কালাম আজাদ (সাবেক বিদ্যুৎ সচিব): কুইক রেন্টাল ব্যবস্থার আইনি রূপকার। বিদ্যুৎ না পেলেও ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা এবং এসব দুর্নীতিকে বিচারিক সুরক্ষার বাইরে রাখতে ‘ইনডেমনিটি অ্যাক্ট’ বা দায়মুক্তি আইন প্রণয়ন করেন।

৩. নসরুল হামিদ বিপু (সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী): টানা ১০ বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালনকালে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতকে পারিবারিক সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেন। তাঁর বিরুদ্ধে মাতারবাড়ী এলপিজি টার্মিনাল প্রকল্পসহ ডিপিডিসি ও নেসকোর হাজার কোটি টাকার স্মার্ট মিটার প্রকল্প স্বজনদের ফার্মের (যেমন: পাওয়ারকো, ডেলকো) মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই, লন্ডন, মাল্টা ও সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের অন্তত ১৬টি দেশে তাঁর শত শত কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে।

৪. ইন্তেখাবুল হামিদ অপু (বিপুর ছোট ভাই): ভাইয়ের ক্ষমতার সুযোগে চারটি বেনামী কোম্পানির মাধ্যমে ডিপিডিসি, নেসকো ও সোলার প্রজেক্ট থেকে প্রায় ৮,০০০ কোটি টাকার মেগা কাজ বাগিয়ে নেন।

৫. ড. আহমদ কায়কাউস (সাবেক মুখ্য সচিব ও বিদ্যুৎ সচিব): নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থেকে তথাকথিত ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’-এর নীতিমালা বাস্তবায়নে ত্বরান্বিত করেন, যা পরবর্তীতে দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতের ওপর স্থায়ী স্থায়ী বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

বিগত সরকারের আমলের এই অপরিকল্পিত নীতি, দুর্নীতি এবং ডলার সংকটের কারণে সৃষ্ট পাহাড়সম ঋণের মাশুল এখন দিতে হচ্ছে পুরো দেশকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *