অধিকাংশ শিল্পকারখানা বন্ধ, আটকে আছে অর্থায়ন; একটি কারখানা চালুর জন্য ২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব, দুই প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণসুবিধায় ছাড়
ঢাকা: একসময় বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত বেক্সিমকো এখন গভীর আর্থিক ও পরিচালনাগত সংকটে। বিপুল ঋণ ও দায়, ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ থাকার জটিলতা, প্রশাসনিক কর্মীদের বেতন বকেয়া এবং অধিকাংশ শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্রুপটির ব্যবসা পুনরুজ্জীবন কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে একটি বন্ধ পোশাক কারখানা চালুর জন্য বিদেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব এবং গ্রুপটির দুটি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণসুবিধায় ছাড় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড–এর ২৫ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যায়নে বেক্সিমকো গ্রুপের মোট দায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি ছিল। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। ঋণ আদায়ে সম্পদ বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হলেও আগের নিলামে ক্রেতা পাওয়া যায়নি।
বেতন বকেয়া, বন্ধ অধিকাংশ কারখানা
বেক্সিমকো গ্রুপের একসময়কার বিস্তৃত শিল্পকার্যক্রমে বস্ত্র ও পোশাক, ওষুধ, সিরামিকস, জ্বালানি, আবাসন, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাত অন্তর্ভুক্ত ছিল। গ্রুপটিতে একপর্যায়ে ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ কাজ করতেন। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায় বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। রপ্তানি আয় কমে যাওয়া, ঋণের চাপ এবং ব্যাংকিং কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
গাজীপুরের বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খুলতে না পারায় প্রায় ১৫টি বস্ত্র কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। উৎপাদন বিভাগের প্রায় ৪৪ হাজার কর্মীকে ছাঁটাইয়ের আগে তাঁদের আইনগত পাওনা দেওয়া হয়েছিল বলে TBS-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে, প্রশাসনিক বিভাগের বহু কর্মকর্তা-কর্মচারী দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে গেছেন।
ঋণ ও আইনি জটিলতায় আটকে পুনরুদ্ধার
বেক্সিমকোর আর্থিক সংকটের পাশাপাশি ঋণসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ ও আইনি জটিলতাও ব্যবসা পুনরুদ্ধারের পথে বাধা তৈরি করছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গ্রুপটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঋণ জালিয়াতি, অর্থপাচার ও অনিয়মিত ঋণ গ্রহণের অভিযোগে একাধিক মামলা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এসব অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওসমান কায়সার চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ থাকায় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অর্থ ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন অর্থায়ন পেতে প্রয়োজনীয় করপোরেট সিদ্ধান্ত ও নথিপত্রের জটিলতাও রয়েছে। তাঁর মতে, মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কারণে কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে থাকা উচিত নয়। তবে গ্রুপের আর্থিক দায় ও ঋণ পরিশোধের বিষয়টি সমাধান না হলে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরা কঠিন।
২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব
বন্ধ কারখানা চালুর ক্ষেত্রে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিদেশি বিনিয়োগের একটি প্রস্তাব। দ্য ডেইলি স্টার–এর ৭ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান Charter HCP Ltd এবং চীনা প্রতিষ্ঠান Besting Ltd গাজীপুরের বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে অবস্থিত Prefix Fashions Ltd আংশিকভাবে চালুর জন্য সম্মিলিতভাবে ২ কোটি ৩০ লাখ ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, পাঁচ বছরের লিজভিত্তিক ব্যবস্থায় কারখানাটির কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় অনুমোদন দরকার। ফলে বিনিয়োগ প্রস্তাবকে এখনই কারখানা পুনরায় চালু হওয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এর আগে বেক্সিমকোর বন্ধ বস্ত্র কারখানাগুলো চালুর জন্য বিদেশি অর্থায়নের আরেকটি উদ্যোগ শেষ পর্যায়ে গিয়েও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে নতুন প্রস্তাবটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে অনুমোদন, অর্থায়ন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে চুক্তি কার্যকরের ওপর।
দুটি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ছাড়
সংকটের মধ্যে ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক বেক্সিমকো এলপিজি ইউনিট-১ এবং শাইনপুকুর সিরামিকসের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঋণসুবিধার বিধিনিষেধ শিথিল করেছে। দ্য ডেইলি স্টার ও বিডিনিউজ২৪ ডটকম–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শর্তসাপেক্ষে প্রতিষ্ঠান দুটি ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবে।
বেক্সিমকো এলপিজি ইউনিট-১ শতভাগ নগদ মার্জিনের বিপরীতে ঋণপত্র খুলতে এবং কার্যকরী মূলধন সুবিধা নিতে পারবে। এই ছাড় ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা। এর লক্ষ্য প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত কার্যক্রম সচল রাখতে সহায়তা করা। তবে এ সিদ্ধান্ত পুরো বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণসংকটের সমাধান নয়; সুবিধাগুলো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও শর্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
সব ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ নয়
গ্রুপটির অধিকাংশ শিল্পকারখানা বন্ধ থাকলেও কিছু প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন মাত্রায় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। TBS-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাচ্ছিল, শাইনপুকুর সিরামিকস আংশিকভাবে পরিচালিত হচ্ছিল এবং তিস্তা সোলার পার্ক জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছিল। তবে একটি প্রতিষ্ঠানের আয় দিয়ে পুরো গ্রুপের দায় ও পরিচালন ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে কি না, তা বড় প্রশ্ন হয়ে রয়েছে।
ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত সমাধান
বেক্সিমকোর পুনরুদ্ধার শুধু নতুন বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করছে না। এর জন্য ঋণদাতাদের সঙ্গে দায় নিষ্পত্তির বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, ব্যাংকিং কার্যক্রম স্বাভাবিক করা, কর্মীদের পাওনা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন এবং স্বচ্ছ করপোরেট ব্যবস্থাপনা জরুরি।
বিদেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব ও নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণসুবিধায় ছাড় কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে। তবে প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত বেক্সিমকোর সামগ্রিক পুনরুদ্ধার অনিশ্চিতই থাকবে। এখন দেখার বিষয়, নতুন অর্থায়ন ও নীতিগত সহায়তাকে কাজে লাগিয়ে গ্রুপটি কতটা উৎপাদন ফিরিয়ে আনতে পারে এবং ঋণ ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়।


