জাতীয় ডেস্ক | সংবাদ সারাদিন
বিদ্যুৎ খাতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এড়িয়ে প্রকল্প অনুমোদন এবং চুক্তি নিয়ে জবাবদিহি সীমিত করার সুযোগ তৈরি করেছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রণীত বিশেষ আইন—এমন অভিযোগ উঠেছে। ২০১০ সালে করা ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’ পরবর্তী সময়ে বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের কেন্দ্রে আসে।
জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর যুক্তিতে আইনটি প্রণয়ন করা হলেও এর আওতায় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি করা হয়েছিল। আইনটির কিছু বিধানে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের বৈধতা আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ সীমিত থাকায় এটি ‘দায়মুক্তি আইন’ নামে পরিচিতি পায়। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অর্থনীতিবিদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক দলগুলো সমালোচনা করেছে।
দরপত্র ছাড়াই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ
আইনটির আওতায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে উন্মুক্ত দরপত্রের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি করার ব্যবস্থা প্রকল্পের ব্যয়, বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দেয়।
গবেষক ও সমালোচকদের অভিযোগ, প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া না থাকায় কিছু বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিক আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন, অন্যদিকে সরকারকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনা ও কেন্দ্রের সক্ষমতা বাবদ অর্থ পরিশোধের চাপ বহন করতে হয়েছে। এসব অভিযোগের নির্দিষ্ট দায় নির্ধারণে প্রকল্পভিত্তিক নথি, চুক্তি ও নিরীক্ষার তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
আইনের আওতায় বিপুল ব্যয়ের প্রশ্ন
বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহার কম থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী কেন্দ্রভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের বিষয়টি অর্থনৈতিক বিতর্কের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও নির্দিষ্ট শর্তে কেন্দ্রের সক্ষমতা প্রস্তুত রাখার জন্য এ ধরনের অর্থ দিতে হয়।
সমালোচকদের মতে, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা এবং ব্যয়বহুল চুক্তির কারণে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের আর্থিক চাপ বেড়েছে। তবে সব প্রকল্পের ব্যয়, চুক্তির শর্ত ও আর্থিক প্রভাব এক নয়; সুনির্দিষ্ট মূল্যায়নের জন্য পৃথক তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
দায়মুক্তি আইন বাতিল
পরবর্তী সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ বাতিল করা হয়। ২০২৪ সালের নভেম্বরে আইনটি বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়। তবে আইনটির আওতায় আগে সম্পাদিত চুক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ ও বৈধতা নিয়ে আলাদা আইনি প্রশ্ন রয়েছে।
আইনটি বাতিলের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ খাতে ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি নতুন করে গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে অতীতের চুক্তিগুলোর ব্যয়, শর্ত এবং জনস্বার্থের ওপর প্রভাব পর্যালোচনার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত, নিরীক্ষা এবং প্রমাণভিত্তিক আইনি প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ ও প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য বজায় রেখে সংশ্লিষ্ট দায় নির্ধারণ করাই এ ক্ষেত্রে মূল বিষয়।


