সংবাদ সারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিধিসম্মত অনুমোদন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই চুয়াডাঙ্গা জেলায় অবাধে চলছে ১৩৬টি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। জেলার চার উপজেলায় অনলাইনে নিবন্ধিত ১৮৪টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সিংহভাগেরই বিগত প্রায় তিন বছর ধরে লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি। প্রয়োজনীয় আইনি বৈধতা না থাকা সত্ত্বেও এসব বেসরকারি হাসপাতালে নিয়মিত অস্ত্রোপচার, জটিল চিকিৎসা ও স্পর্শকাতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ চালানো হচ্ছে। এর ফলে চিকিৎসা নিতে এসে ভুল চিকিৎসা ও ভুল পরীক্ষার রিপোর্টের শিকার হয়ে প্রতিনিয়ত চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন সাধারণ রোগীরা, যার ফলে বেশ কয়েকটি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। সরকারি নজরদারির ঘাটতি এবং প্রশাসনের শিথিলতার কারণেই অননুমোদিত এসব প্রতিষ্ঠান বহাল তবিয়তে তাদের বাণিজ্যিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ভুক্তভোগী ও সুশীল সমাজ।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, লাইসেন্স নবায়ন আটকে থাকার পেছনে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবেশগত ছাড়পত্রের অভাব, চিকিৎসা-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চরম অনিয়ম এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত নীতিমালার লঙ্ঘন। চুয়াডাঙ্গা সদর, আলমডাঙ্গা, দামুড়হুদা ও জীবননগর উপজেলায় পরিবেশ অধিদপ্তরের তালিকায় থাকা ১৬২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শর্ত পূরণ করে মাত্র ৩৭টি ছাড়পত্র পেতে সমর্থ হয়েছে এবং ১১৯টি প্রতিষ্ঠান এখনও অযোগ্য অবস্থায় রয়ে গেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের চিকিৎসা-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০০৮ অনুযায়ী বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত মানদণ্ড বজায় না রাখায় সরকারি অনুমোদন আটকে আছে। এছাড়া নতুন করে আরও কিছু নতুন প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সের জন্য আবেদন জানালেও পরিবেশ ছাড়পত্রের জট ছাড়াতে পারছে না সিভিল সার্জন কার্যালয়।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, লাইসেন্স নবায়নের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর বিভিন্ন উপজেলায় নিয়মিত অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দীন আহমেদ জানান, পরিবেশগত ছাড়পত্র না মেলায় লাইসেন্স প্রদান করা সম্ভব হয়নি, তবে ভুয়া বা অনিয়মকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে উপজেলাওয়ারি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে স্থানীয় নাগরিক সমাজ ও চিকিৎসকদের একাংশের অভিযোগ, স্বাস্থ্য বিভাগের এসব সাময়িক অভিযান কেবলই লোক দেখানো। প্রায়শই অভিযানে কোনো প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হলেও কিছুদিন পর রহস্যজনকভাবে তা আবারও চালু হয়ে যায়। অসাধু সুবিধার বিনিময়ে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে কি না—তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
গত আগস্ট মাসে জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির মিটিংয়ে জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার অবৈধ চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে সময়সীমা নির্দিষ্ট করে সিভিল সার্জনকে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বললেও বাস্তবে অবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি। দীর্ঘ তিন বছর ধরে সরকারি নিয়ম অমান্য করে এবং ছাড়পত্র ছাড়া এসব ক্লিনিক কীভাবে অপারেশন চালিয়া যাচ্ছে তা নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করার তাগিদে সাময়িক অভিযানের পরিবর্তে লাইসেন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্রহীন এসব অবৈধ ডায়াগনস্টিক ও ক্লিনিকের বিরুদ্ধে স্থায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।


