২০২৫–২৬ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা

সংবাদ সারাদিন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৬ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৬ আগস্ট ২০২৬

অটোমেশন, করজাল সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও ২০২৫–২৬ অর্থবছরে নির্ধারিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড—এনবিআর। সংস্থাটির সাময়িক হিসাবে, বিদায়ী অর্থবছরে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা।

এনবিআরের হালনাগাদ সাময়িক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত কাস্টমস, মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট এবং আয়কর—এই তিন প্রধান খাত থেকে মোট ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। বিপরীতে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। এ হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮২ দশমিক ৬ শতাংশ আদায় করতে পেরেছে এনবিআর এবং ঘাটতির হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ।

প্রাথমিক বাজেটে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জন্য এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। পরে সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা আরও ৪ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু অর্থবছর শেষে আদায় সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা কম হয়েছে।

এ নিয়ে টানা দশম অর্থবছরের মতো সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে ব্যর্থ হলো এনবিআর। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, সংকীর্ণ করজাল, কর প্রশাসনের সীমিত সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যাশিত গতি না থাকায় রাজস্ব আদায় কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

ভ্যাট থেকে সর্বোচ্চ রাজস্ব

২০২৫–২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট। এই খাত থেকে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা, যা এনবিআরের মোট রাজস্ব আদায়ের প্রায় ৩৮ শতাংশ।

আগের ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ভ্যাট থেকে আদায় হয়েছিল ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে ভ্যাট আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৪১ শতাংশ।

ভ্যাট দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও ভোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ব্যবসা-বাণিজ্য, পণ্য বিক্রি এবং বিভিন্ন সেবার ওপর আরোপিত ভ্যাটের মাধ্যমে এ রাজস্ব আদায় করা হয়। তবে ভ্যাট ব্যবস্থায় অটোমেশন ও ইলেকট্রনিক চালান ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরও সব প্রতিষ্ঠানকে কার্যকরভাবে করের আওতায় আনা যায়নি বলে রাজস্ব খাতসংশ্লিষ্টরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন।

সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি আয়কর খাতে

বিদায়ী অর্থবছরে তিনটি প্রধান খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি এসেছে আয়কর থেকে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে আয়কর বাবদ আদায় হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এ খাতে আদায়ের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ৯০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।

এ হিসাবে আয়কর আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৮০ শতাংশ। মোট এনবিআর রাজস্বের প্রায় ৩৫ শতাংশ এসেছে আয়কর থেকে।

আয়কর খাতে প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক বেশি হলেও তা সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য যথেষ্ট ছিল না। অর্থনীতিবিদেরা করযোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে করজালের আওতায় আনা, বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে নতুন করদাতা শনাক্ত করা এবং কর ফাঁকি রোধে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

কাস্টমসে আদায় ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা

আমদানি ও রপ্তানি পর্যায়ের শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং সংশ্লিষ্ট কর থেকে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে মোট ১ লাখ ১২ হাজার ১১৯ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। আগের অর্থবছরে এ খাত থেকে আদায় হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৯৮ কোটি টাকা।

ফলে কাস্টমস খাতে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৯০ শতাংশ। মোট রাজস্ব আদায়ের প্রায় ২৭ শতাংশ এসেছে কাস্টমস ও সম্পূরক শুল্ক থেকে।

তিনটি প্রধান খাতের হিসাব যোগ করলে মোট রাজস্ব আদায়ের চিত্র দাঁড়ায়—

ভ্যাট: ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা
আয়কর: ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬২০ কোটি টাকা
কাস্টমস ও সম্পূরক শুল্ক: ১ লাখ ১২ হাজার ১১৯ কোটি টাকা
মোট: ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা।

আদায় বেড়েছে, তবু লক্ষ্য পূরণ হয়নি

লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বড় ঘাটতি থাকলেও আগের অর্থবছরের চেয়ে রাজস্ব আদায় বেড়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এনবিআরের মোট আদায় ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকার কিছু বেশি। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ৪৪ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ০৩ শতাংশ। কিন্তু সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এই প্রবৃদ্ধির পরও বড় ঘাটতি থেকে গেছে।

এনবিআরের কর্মকর্তারা রাজস্ব আদায়ের সীমিত প্রবৃদ্ধির জন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধীরগতি ও সরকারি ব্যয়ের দুর্বলতাকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থনীতিবিদেরা একই সঙ্গে অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা এবং রাজস্ব প্রশাসনের কাঠামোগত দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন।

রাজস্ব ঘাটতির প্রভাব কী?

বড় অঙ্কের রাজস্ব ঘাটতি সরকারের সামগ্রিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ রাজস্ব আয় থেকেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ঋণের সুদ পরিশোধ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের বড় অংশের ব্যয় নির্বাহ করা হয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় না হলে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকঋণ বা বৈদেশিক ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হতে পারে। অতিরিক্ত ঋণের কারণে ভবিষ্যতে সুদ ও আসল পরিশোধের ব্যয় বাড়ে। তখন উন্নয়ন প্রকল্প এবং সামাজিক খাতের জন্য অর্থ বরাদ্দের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ বেড়ে গেলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতাও কমতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত সরকারি ঋণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে কঠিন করে তুলতে পারে বলে অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করেছেন।

নতুন অর্থবছরে আরও বড় চ্যালেঞ্জ

চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে এনবিআরের জন্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। বিদায়ী অর্থবছরের ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকার সাময়িক আদায়ের তুলনায় নতুন লক্ষ্য প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা বেশি।

এই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে এনবিআরকে আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের অতীত প্রবণতা বিবেচনায় এ লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া নতুন অর্থবছরেও বড় ধরনের ঘাটতির ঝুঁকি থাকতে পারে।

কর প্রশাসনকে সম্পূর্ণ অটোমেশনের আওতায় আনা, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্যভান্ডারের মধ্যে সমন্বয় তৈরি, কর ফাঁকি রোধ, করযোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান শনাক্ত এবং করদাতাবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শুধু লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর পরিবর্তে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।

এনবিআরের প্রকাশিত তথ্য সাময়িক হওয়ায় পরবর্তী যাচাই ও সমন্বয়ের পর মোট রাজস্ব আদায় এবং ঘাটতির অঙ্কে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। তাই সংবাদে তথ্যটিকে সাময়িক হিসাব হিসেবে উল্লেখ করাই যথাযথ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *