সংবাদ সারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২৬
জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে ক্ষতিগ্রস্ত শপিং মল, কারখানা ও ধসে পড়া বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালাচ্ছেন সেনাসদস্য ও জরুরি উদ্ধারকর্মীরা। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কিউশু দ্বীপের কুমামোতো এলাকায় ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। জাপানের আবহাওয়া সংস্থা—জেএমএ ভূমিকম্পটির মাত্রা ৭ দশমিক ১ জানিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা প্রাথমিকভাবে একই মাত্রা জানালেও পরে তা সংশোধন করে ৬ দশমিক ৮ উল্লেখ করেছে। জাপানের নিজস্ব ‘শিনদো’ ভূকম্পন তীব্রতা স্কেলে এটি সর্বোচ্চ ৭ মাত্রায় পৌঁছায়।
ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল কুমামোতো শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে। শক্তিশালী কম্পনে বিভিন্ন স্থানে বাড়িঘর ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সড়কে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে এবং কয়েকটি সেতু ও যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শপিং মলে বিস্ফোরণ, ধসে পড়ে ভবনের অংশ
ভূমিকম্পের প্রায় এক ঘণ্টা পর কুমামোতোর কাশিমা এলাকার একটি বৃহৎ এইওন শপিং মলে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণে ভবনটির একটি অংশ এবং দ্বিতীয় তলার কিছু অংশ ধসে পড়ে। ধ্বংসস্তূপ থেকে আটজনকে উদ্ধার করা হলেও তাদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
মল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রাথমিক ভূমিকম্পের পর ক্রেতা ও কর্মীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কর্মীর তথ্য যাচাইয়ের পরও চার কর্মীর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। ভবনের ভেতরে গ্যাসের গন্ধ পাওয়া যাওয়ায় সম্ভাব্য গ্যাস বিস্ফোরণের বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেছেন, এখনো অনেকে উদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছেন এবং তাদের জীবিত উদ্ধারে প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ধারকাজে উপলব্ধ সব ধরনের জনবল ও সরঞ্জাম ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
কাগজকলের চিমনি ধসে নিখোঁজ সাতজন
কুমামোতো প্রিফেকচারের ইয়াতসুশিরো শহরে নিপ্পন পেপার ইন্ডাস্ট্রিজের একটি কারখানার বড় চিমনি ধসে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচে বেশ কয়েকজন শ্রমিক আটকা পড়েন। বুধবার পর্যন্ত সেখানে সাতজন নিখোঁজ ছিলেন এবং চারজন গুরুতর আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
জাপানের সেলফ-ডিফেন্স ফোর্স, পুলিশ ও অগ্নিনির্বাপণ বিভাগের সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন। দুর্যোগ মোকাবিলা ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে সাড়ে চার হাজারের বেশি সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে ৯ হাজারের বেশি মানুষ
নিরাপত্তার কারণে কুমামোতোসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার বাসিন্দাকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৯ হাজারের বেশি মানুষ পাঁচ শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছেন।
প্রায় ৩৬ হাজার ৯০০ বাড়িতে বিদ্যুৎ এবং সাড়ে ৯ হাজার বাড়িতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। কিছু এলাকায় মোবাইল ও যোগাযোগ নেটওয়ার্কও অচল হয়ে পড়েছে। তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় আশ্রিতদের হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হাসপাতাল ও যোগাযোগব্যবস্থায় চাপ
ভূমিকম্পে আহতদের চিকিৎসা দিতে স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় কয়েকটি হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। উকি শহরের একটি হাসপাতাল অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে না পেরে নতুন রোগী ভর্তি সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে। ভূমিকম্পের পর হাসপাতালটি ৮৬ জন আহত ব্যক্তিকে গ্রহণ করে।
কিউশু শিনকানসেন বুলেট ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। কুমামোতো বিমানবন্দরের একটি রানওয়ে বন্ধ হওয়ার পর কার্যক্রম সীমিতভাবে শুরু হলেও কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভূমিকম্পের সময় ট্রেনে থাকা কয়েকজন যাত্রীও আহত হয়েছেন।
সুনামি সতর্কতা প্রত্যাহার
ভূমিকম্পের পর উপকূলীয় এলাকার জন্য সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। তবে প্রায় দুই ঘণ্টার মধ্যে সেটি প্রত্যাহার করা হয়। সংশ্লিষ্ট এলাকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো অস্বাভাবিকতা শনাক্ত হয়নি।
জাপানের আবহাওয়া সংস্থা সবচেয়ে বেশি কম্পন অনুভূত এলাকাগুলোতে প্রায় এক সপ্তাহ শক্তিশালী পরাঘাত ও ভূমিধসের ঝুঁকি থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছে। বুধবার সকাল পর্যন্ত বিভিন্ন মাত্রার ৬০টির বেশি পরাঘাত রেকর্ড করা হয়েছে।
এর আগে ২০১৬ সালে কুমামোতো অঞ্চলে ভয়াবহ ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। সেই ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ঐতিহাসিক কুমামোতো দুর্গের পাথরের দেয়াল নতুন ভূমিকম্পেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উদ্ধারকর্মীরা এখন নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। একই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র নির্ধারণ, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং আশ্রয়কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছানোর কাজ চলছে।
ছবির ক্যাপশন: শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর জাপানের কুমামোতো অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনায় চলছে উদ্ধার অভিযান। ছবি: সংগৃহীত


