জাতীয় ডেস্ক | সংবাদ সারাদিন
দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে প্রায় ৪০০টি হোটেল, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ফায়ার লাইসেন্স নেই। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রায় ৫০০টি এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১০০টি ফায়ার লাইসেন্স নিয়েছে। সম্প্রতি ইনানীর টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর পর এসব প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তা এবং সরকারি নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সময় নিউজের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, লাইসেন্সের ঘাটতির পাশাপাশি জনবলসংকট, অনুমোদনহীন স্থাপনা এবং নিরাপত্তাবিধি বাস্তবায়নে দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন ছাড়াই চলছে বহু প্রতিষ্ঠান
কক্সবাজার শহরের হোটেল-মোটেল জোন থেকে মেরিন ড্রাইভের ইনানী ও আশপাশের এলাকায় গত কয়েক বছরে হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁর সংখ্যা বেড়েছে। পর্যটকদের চাহিদা মেটাতে এসব স্থাপনার বিস্তার ঘটলেও সব প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনিরাপত্তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ারের বরাতে সময় নিউজ জানিয়েছে, প্রায় ৫০০টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১০০টির ফায়ার লাইসেন্স রয়েছে। অনলাইন ই-লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় আবেদন করেছে ৫২টি প্রতিষ্ঠান।
অর্থাৎ, ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪০০টি প্রতিষ্ঠান ফায়ার লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছে। তবে লাইসেন্স না থাকা মানেই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের নিরাপত্তাঘাটতি রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট স্থাপনার অবস্থা ও অনুমোদনের নথি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
টুপটুপ রিসোর্টের আগুনে প্রাণ গেছে ১০ পর্যটকের
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী এলাকার পাটুয়ারটেকে টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। তিনতলা কাঠের স্থাপনাটিতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিলেন।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটি অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল। জুন মাসে পরিদর্শনের পর প্রতিষ্ঠানটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়া হয়েছিল বলে ১৭ অক্টোবরের প্রতিবেদনে জানানো হয়। তা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি চালু ছিল।
অগ্নিকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। তবে দুর্ঘটনার পর রিসোর্টটির অনুমোদন, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং আগের সতর্কবার্তার পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সেসব বিষয় নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সতর্কবার্তার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি?
সময় নিউজের প্রতিবেদনে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) কর্মকর্তারা বলেছেন, কিছু রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর মালিক প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা বাস্তবায়নে অনীহা দেখান। তাঁদের অভিযোগ, নোটিশ ও জরিমানার পরও কোনো কোনো স্থানে অনিয়ম চলতে থাকে।
কউকের অথরাইজড অফিসার ফজলে রাব্বি জানান, আইন লঙ্ঘনকারী স্থাপনার বিরুদ্ধে নোটিশ, জরিমানা ও উচ্ছেদমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কিছু ক্ষেত্রে একই স্থানে আবার অবৈধ নির্মাণ গড়ে ওঠে। তাঁর মতে, শুধু সতর্কতা বা সাময়িক জরিমানা নয়, প্রয়োজনে আরও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা অনুমোদনহীন স্থাপনা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁদের ভাষ্য, জনবলসংকট ও দ্রুত নির্মাণকাজের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে দেরি হয়।
জনবলসংকটে নিয়মিত তদারকি কঠিন
কক্সবাজারে পর্যটন ব্যবসার প্রসারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সব প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়মিত পরিদর্শন করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিডিনিউজ২৪-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়েছে, পুরো জেলায় বাণিজ্যিক স্থাপনা পরিদর্শনের জন্য অনুমোদিত পরিদর্শক পদ রয়েছে মাত্র একটি। ওই পদে কর্মরত ব্যক্তিকে বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০টি প্রতিষ্ঠানের তদারকির দায়িত্ব সামলাতে হয়।
তবে জনবলসংকট থাকলেও ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপরই থাকে। বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, নোটিশ দেওয়া বা জরিমানা করার পাশাপাশি ঝুঁকি কমেছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
কাঠের স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ
ইনানী ও মেরিন ড্রাইভ এলাকার কিছু রিসোর্ট কাঠ, বাঁশ ও অন্যান্য দাহ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি। এসব স্থাপনা দেখতে আকর্ষণীয় হলেও পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং পর্যটকদের বেরিয়ে যাওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা কাঠের স্থাপনার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, পানির সংরক্ষণব্যবস্থা, উপযুক্ত পাইপলাইন, স্প্রিংকলার এবং নিরাপদ জরুরি বহির্গমনপথ নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। স্থাপনার ধরন ও প্রযোজ্য বিধিমালা অনুযায়ী এসব ব্যবস্থা নির্ধারণ করতে হবে।
টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডে আগুনের উৎস, স্থাপনার কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং জরুরি বের হওয়ার পথের অবস্থা তদন্ত করে দেখার বিষয় রয়েছে। তদন্তের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে কোনো নির্দিষ্ট ত্রুটিকে দুর্ঘটনার নিশ্চিত কারণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
এক সপ্তাহের মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা
সময় নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন, ইনানী ও মেরিন ড্রাইভ এলাকার কয়েকটি অবৈধ স্থাপনাকে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সেখানে অন্তত দুটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান।
এদিকে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় রিসোর্টের মালিক ও ব্যবস্থাপকসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলে একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার অভিযোগ ও তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে পরবর্তী তথ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যটনশিল্পের বিকাশের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্ন
কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পে হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যবসায়িক অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স, নিয়মিত পরিদর্শন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বের হওয়ার ব্যবস্থা কার্যকর থাকা জরুরি।
সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের পর মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করার পর সেগুলোকে নিরাপদ করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে আইন কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। কক্সবাজারকে নিরাপদ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত তদারকি ও নিয়মিত জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ।


