অভ্যন্তরীণ আন্দোলন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে টানাপোড়েন ও রুপির দুর্বলতা—একসঙ্গে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে নয়াদিল্লি

Table of content

Table of content

সংবাদ সারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০২৬

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরকারের সামনে একসঙ্গে একাধিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে তরুণদের বিক্ষোভ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং ভারতীয় মুদ্রা রুপির ওপর বাড়তি চাপ সরকারকে নতুন করে উদ্বেগে ফেলেছে। এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রত্যাহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

জাগোনিউজ২৪-এর প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্যের বরাতে বলা হয়েছে, মোদী সরকারের সামনে বর্তমানে প্রধানত তিনটি চাপ রয়েছে—অভ্যন্তরীণ আন্দোলন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।

ভোটার তালিকা নিয়ে বিক্ষোভ, চাপে সরকার

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির বিভিন্ন এলাকায় ভোটার তালিকা পর্যালোচনার উদ্যোগের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শত শত মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা এবং যাতায়াত সীমিত হওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

এ আন্দোলনে তরুণদের সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) আলোচনায় এসেছে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া সংগঠনটি এবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে লক্ষ্য করে প্রতিবাদ কর্মসূচি চালাচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর শুরু হওয়া ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মৃত ব্যক্তি, অন্যত্র চলে যাওয়া ভোটার এবং যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি—এমন ব্যক্তিদের নাম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যদিও সিজেপি এখনো কোনো নির্বাচনে অংশ নেয়নি, তাদের আন্দোলন রাজনৈতিক মহলে মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফিচ সলিউশন্সের একটি বিভাগ বিএমআইয়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক সপ্তাহে সংগঠনটির আন্দোলন আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে বড় শহরের বাইরে আন্দোলনের অংশগ্রহণ কতটা বাড়বে, তা এখনো অনিশ্চিত।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা

ভারতের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক। কয়েক মাস ধরে আলোচনায় থাকা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তির অগ্রগতি থমকে গেছে বলে ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন জানিয়েছেন।

রাশিয়া থেকে তেল কেনা দেশগুলোর ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেওয়ার একটি প্রস্তাবিত আইনকে এই অচলাবস্থার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে ভারত ও চীনের মতো দেশও প্রভাবিত হতে পারে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি, পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক এবং ভারতকে নিয়ে মার্কিন অবস্থান দেশটির জনগণের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতিতে মোদী সরকারের পক্ষে কেবল সমঝোতার সুর বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কর্মী পাঠানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মসূচি সীমিত করার উদ্যোগও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মী পাঠানোর ওপর নির্ভরতা কমানোয় এর তাৎক্ষণিক প্রভাব সীমিত হতে পারে।

রুপির ওপর চাপ, উদ্বেগে বিনিয়োগকারীরা

রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপের পাশাপাশি ভারতীয় মুদ্রা রুপির দুর্বলতাও সরকারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের উচ্চমূল্য এবং বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ভারতীয় সম্পদ বিক্রি করে অর্থ তুলে নেওয়ার কারণে রুপির ওপর চাপ বাড়ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের অর্থনীতি ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি বজায় রাখলেও উচ্চ জ্বালানি ব্যয় ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রত্যাহার মুদ্রার বিনিময়মূল্য এবং অর্থনীতিতে মূলধনের প্রবাহের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

রুপির দরপতন ঠেকাতে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে প্রায় চার বছরের মধ্যে প্রথমবার সুদের হার বাড়ানো হলেও রুপির দুর্বলতা পুরোপুরি ঠেকানো যায়নি। পরে ডলারের চাহিদা কমাতে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

মুম্বাইভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান সিস্টেম্যাটিক্স গ্রুপের প্রধান নির্বাহী ধনঞ্জয় সিনহার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক উত্তেজনা ভারতের সামষ্টিক অর্থনীতির সম্ভাবনা ও মুদ্রার স্থিতিশীলতার জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।

মূল্যস্ফীতিও বাড়াচ্ছে চাপ

ভারতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে দেশটির মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ পরিবারের ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

ভারতের অর্থনীতি দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অসন্তোষ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক টানাপোড়েন, রুপির দুর্বলতা ও মূল্যস্ফীতির সম্মিলিত প্রভাব সরকারের নীতিনির্ধারণকে কঠিন করে তুলতে পারে।

তবে এসব চাপ কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং মোদী সরকার কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবে, তা নির্ভর করবে বিক্ষোভের গতিপ্রকৃতি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনার অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে নেওয়া পদক্ষেপের কার্যকারিতার ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *