সংবাদ সারাদিন ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬ সেপ্টেম্বর | আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ বা মারাত্মক ব্যাহত হওয়ার কারণে সংকটে পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। সংঘাত শুরুর প্রথম চার মাসেই (মার্চ-জুন) বিপিসির সরাসরি ক্ষতি হয়েছিল ১৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এরপর আরও দুই মাস গড়ালেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় বর্তমানে বাংলাদেশের সার্বিক ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ২৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
জ্বালানি তেল ও খাদ্যপণ্য আমদানি, শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ বিলম্বিত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে জাহাজের অতিরিক্ত ভাড়া ও বিমা খরচের কারণে দেশের ওপর অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সম্ভাব্য বড় ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলায় গত ১ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অর্থ, নৌপরিবহন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ সংশ্লিষ্ট শীর্ষ পাঁচ মন্ত্রণালয়কে জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতি নিরূপণ ও সুপারিশ পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে এই সংকটের বহুমুখী অভিঘাত নিচে তুলে ধরা হলো:
১. এলএনজি ও জ্বালানি খাতে রেকর্ড ভর্তুকি চাপ
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে অচলাবস্থার কারণে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে বিশ্ববাজারের স্পাট মার্কেট (Spot Market) থেকে অতিরিক্ত দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে সরকারকে। যুদ্ধের আগে স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ১০-১২ ডলার থাকলেও তা বেড়ে ২৪ ডলার ছাড়িয়েছে। ফলে এলএনজি খাতেই ভর্তুকির পরিমাণ ৬ হাজার কোটি থেকে লাফিয়ে ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় ঠেকেছে। চলতি অর্থবছর জুড়ে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে বাংলাদেশকে আরও প্রায় ৪২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত আমদানির বাড়তি চাপ সামলাতে হতে পারে।
২. ডলারের ওপর বাড়তি চাপ ও মূল্যস্ফীতি
জ্বালানি মজুদ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত ৪ লাখ ৮০ হাজার টন জ্বালানি তেল কেনার সিদ্ধান্তে সরকারের অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে প্রায় ৭ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক জাহাজ ভাড়া ও বিমা প্রিমিয়াম বহুগুণ বৃদ্ধিতে আমদানির বিপরীতে ডলারের চাহিদা আকাশচুম্বী হচ্ছে। এটি প্রকারান্তরে দেশীয় মুদ্রা টাকার মান অবমূল্যায়ন এবং বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
৩. তৈরি পোশাক ও শিল্প খাতে মন্দার কালো মেঘ
সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করায় শিল্পের কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগছে। ফলে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী খাতগুলোতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে পণ্য ডেলিভারি দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছে, যা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
৪. শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সে অনিশ্চয়তা
সংঘাতের কেন্দ্রস্থল মধ্যপ্রাচ্য হওয়ায় বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মীদের যাতায়াত ও বিমান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে নতুন কর্মী পাঠানো থমকে যেতে পারে, যা প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহকেও বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলবে।
বিশেষজ্ঞ ও দায়িত্বশীলদের বক্তব্য:
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এই ক্ষতিকে ‘অপূরণীয়’ উল্লেখ করে বলেন, “সংকট মোকাবিলায় সরকার সব ধরনের আগাম পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো নমনীয় না হলে এককভাবে আমাদের মতো আমদানিনির্ভর দেশের অনেক কিছুই করার থাকে না।”
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির (CPD) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, “হরমুজ সংকট বাংলাদেশের জ্বালানি কাঠামোর ভঙ্গুরতাকে উন্মোচিত করেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষা ও মূল্যস্ফীতি সামলাতে অবিলম্বে আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ জ্বালানি উৎপাদনে মনোযোগ দিতে হবে।”
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই (FBCCI)-এর প্রশাসক মো. ফজলুর রহমান উল্লেখ করেন, জ্বালানি ও আমদানির খরচ এভাবে বাড়তে থাকলে পুরো বেসরকারি খাতই বড় ধরনের ধসের মুখে পড়বে। তিনি দ্রুত বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য জোরালো কূটনৈতিক জোর দেওয়ার আহ্বান জানান।


